॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৩৮ ॥

ধূমেনাব্রিয়তে বহ্নিযথাদর্শো মলেন চ ।
যথোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেনেদমাবৃতম্ ॥ ৩.৩৮ ॥

॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৩৮ ॥

ধূমেনাব্রিয়তে বহ্নির্যথাদর্শো মলেন চ ।
য়থোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেনেদমাবৃতম্ ॥ ৩৮ ॥

সরল ভাবার্থ

যেভাবে ধোঁয়া দিয়ে আগুন আবৃত থাকে, যেভাবে ময়লা বা ধুলোবালি দিয়ে আয়না ঢাকা পড়ে এবং যেভাবে জরায়ু বা গর্ভঝিল্লি দিয়ে ভ্রূণ আবৃত থাকে, ঠিক সেভাবেই কামের দ্বারা মানুষের জ্ঞান ঢাকা পড়ে যায়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে কামের (তীব্র বাসনা) প্রভাব বর্ণনা করেছেন। তিনি তিনটি ভিন্ন স্তরের আবরণের উদাহরণ দিয়েছেন, যা মানুষের চেতনার বিভিন্ন অবস্থাকে নির্দেশ করে:

১. ধোঁয়া ও আগুন: এটি 'সত্ত্বগুণ'-এর প্রতীক। ধোঁয়া যেমন আগুনের খুব কাছে থাকে এবং একটু বাতাস দিলেই আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনি সাত্ত্বিক মানুষের জ্ঞান কামের দ্বারা সামান্যই ঢাকা থাকে। সামান্য সৎসঙ্গ বা বিবেকের তাড়নায় তাঁদের জ্ঞান আবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

২. ধুলো ও আয়না: এটি 'রজোগুণ'-এর প্রতীক। আয়নায় ধুলো জমলে যেমন ঘষে পরিষ্কার করতে হয়, তেমনি রাজসিক মানুষের মনে কামের প্রভাব গভীর। তাঁদের জ্ঞান ফিরে পেতে হলে দীর্ঘ সাধনা এবং কর্মযোগের প্রয়োজন হয়।

৩. গর্ভঝিল্লি ও ভ্রূণ: এটি 'তমোগুণ'-এর প্রতীক। মাতৃগর্ভে শিশু যেমন পুরোপুরি আবৃত থাকে এবং সে চাইলেও নড়াচড়া করতে পারে না, তেমনি তামসিক মানুষের জ্ঞান কাম ও মোহের দ্বারা পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সবচেয়ে কঠিন।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জ্ঞান কোথাও হারিয়ে যায় না; এটি কেবল আবৃত বা ঢাকা পড়ে থাকে। আগুনের ভেতরে দহন ক্ষমতা সবসময় থাকে, আয়নার প্রতিফলন ক্ষমতাও থাকে, কিন্তু বাইরের আবরণের জন্য তা দেখা যায় না। ঠিক তেমনি, আমাদের আত্মার শুদ্ধতা কামের আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তোমার ভেতরের কামের এই ধোঁয়া বা ধুলোকে সরিয়ে ফেলো, তবেই তুমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ এবং কর্তব্য দেখতে পাবে। এই শ্লোকটি আমাদের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়।