সরল ভাবার্থ
হে কৌন্তেয়! এই কাম হলো জ্ঞানীদের চিরশত্রু। এটি অগ্নির মতো অতৃপ্ত এবং এর দ্বারাই মানুষের বিবেক বা জ্ঞান সর্বদা আবৃত থাকে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে কামকে কেন 'নিত্যবৈরী' বা চিরশত্রু বলেছেন, তার এক গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে কাম বা বাসনা শুরুতে সুখের মতো মনে হয়, তাই তারা একে শত্রু মনে করে না। কিন্তু একজন 'জ্ঞানী' ব্যক্তি জানেন যে বাসনা মেটানোর চেষ্টা হলো জল দিয়ে তৃষ্ণা মেটানোর বদলে নুন খাওয়া—তৃষ্ণা কমে না বরং আরও বাড়ে।
এখানে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উপমা ব্যবহার করা হয়েছে—'দুষ্পূরেণ অনলেন' অর্থাৎ 'অতৃপ্ত অগ্নি'। আগুনে যত ঘি বা কাঠ ঢালা হয়, আগুন তত বেশি দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে; সে কখনও বলে না যে আমার পেট ভরে গেছে। মানুষের কাম বা বাসনাও ঠিক তেমন। একটি ইচ্ছা পূরণ হলে মন দশটি নতুন ইচ্ছার জন্ম দেয়। এই অতৃপ্ত থাকার গুণটিই কামকে এক ভয়ানক শত্রুতে পরিণত করে।
ধর্মীয় বিচারে, এটি আমাদের জীবনের অশান্তির মূল কারণ চিহ্নিত করে। আমরা ভাবি—বেশি টাকা হলে, বড় গাড়ি হলে বা খ্যাতি পেলে আমি সুখী হব। কিন্তু ভগবান বলছেন, এগুলো আগুনের ঘৃতাহুতির মতো। এটি আপনার ভেতরের শান্তিকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে। অর্জুনকে কৃষ্ণ বলছেন, এই শত্রু অত্যন্ত ছদ্মবেশী। সে তোমার বিবেককে এমনভাবে ঢেকে রাখে যে তুমি অধর্মকেও ধর্ম মনে করতে শুরু করো।
জ্ঞানী ব্যক্তিরা এই মরণফাঁদটি বুঝতে পারেন, তাই তাঁরা বাসনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তাকে শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করেন। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে সুখ কোনো বস্তু পাওয়ার মধ্যে নেই, বরং অহেতুক বাসনা ত্যাগের মধ্যে আছে। কামকে জয় করতে না পারলে প্রকৃত জ্ঞান বা ঈশ্বরের অনুভব কোনোদিনই সম্ভব নয়। এটিই হলো আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রধান অন্তরায়।