॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৬ ॥

কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান বিমুঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে ॥ ৩.৬ ॥

সরল ভাবার্থ

যিনি কর্মেন্দ্রিয়সমূহকে (হাত, পা ইত্যাদি) জোরপূর্বক সংযত করে রেখেছেন, অথচ মনে মনে ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ (ভোগবিলাস) স্মরণ করেন, সেই বিমূঢ়াত্মা ব্যক্তিকে 'মিথ্যাচারী' বা ভণ্ড বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে ভণ্ডামির এক অমোঘ সংজ্ঞা দিয়েছেন। ধর্মীয় পথে চলতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ বাইরের লোক দেখানোর জন্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে, কিন্তু তার মন সারাক্ষণ জাগতিক সুখের চিন্তায় ডুবে থাকে। ভগবান বলছেন, এই ব্যক্তি হলো 'মিথ্যাচার'। অর্জুন যদি আজ যুদ্ধ না করে বনে গিয়ে বসেন, অথচ বনে বসে বসে যুদ্ধের কথা বা তাঁর শত্রুদের কথা ভাবেন, তবে সেই সন্ন্যাস হবে এক বিরাট ভণ্ডামি।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা কেবল বাইরের পোশাকে বা আচার-আচরণে নয়, এটি হলো মনের পবিত্রতা। ইন্দ্রিয় সংযম করার অর্থ কেবল ইন্দ্রিয়গুলোকে বন্ধ করা নয়, বরং মনের ভেতরের বাসনাকে নির্মূল করা। যদি কেউ মনে মনে ভোগের চিন্তা করে আর বাইরে যোগীর বেশ ধরে থাকে, তবে সে নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সতর্ক করছেন যে, কেবল যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেলেই সে মুক্তি পাবে না, বরং তার মন সেই যুদ্ধের স্মৃতিতেই আটকে থাকবে।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো আত্মিক সততার শিক্ষা। আমরা অনেক সময় অন্যের চোখে সাধু হওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু ঈশ্বর আমাদের অন্তরের খবর জানেন। মনের ভেতরে বাসনা রেখে বাইরে ত্যাগের অভিনয় করা হলো 'বিমূঢ়তা' বা বোকামি। কারণ এতে আধ্যাত্মিক উন্নতি তো হয়ই না, উল্টে মানুষ পাপের ভার বহন করে। প্রকৃত সংযম হলো—ইন্দ্রিয়গুলো কাজ করবে, কিন্তু মন থাকবে ভগবানে বা কর্তব্যে। অর্জুনকে তাই কৃষ্ণ বলছেন যে, পালানোর চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের অন্তরের যুদ্ধকে আগে জয় করো। এই শ্লোকটি আধুনিক জীবনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, যা আমাদের শেখায় যে সৎ থাকা মানে কেবল অন্যায় কাজ না করা নয়, অন্যায় চিন্তাও না করা।