॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৭ ॥

যত্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেঽর্জুন ।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে ॥ ৩.৭ ॥

সরল ভাবার্থ

কিন্তু হে অর্জুন! যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে আসক্তিহীনভাবে কর্মেন্দ্রিয়সমূহের সাহায্যে কর্মযোগ অনুষ্ঠান করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

আগের শ্লোকে ভণ্ডামির নিন্দা করার পর, শ্রীকৃষ্ণ এখানে আদর্শ কর্মযোগীর বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ (বিশিষ্যতে), যিনি নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে 'মনসা' বা মনের জোরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এখানে নিয়ন্ত্রণের অর্থ ইন্দ্রিয়গুলোকে মেরে ফেলা নয়, বরং সেগুলোকে সঠিক পথে চালনা করা। আসক্তিহীনতা বা 'অনাসক্তি' হলো এই যোগের মূল চাবিকাঠি।

একজন কর্মযোগী জগতের সব কাজ করেন—তিনি চাকরি করেন, পরিবার সামলান, এমনকি প্রয়োজনে যুদ্ধও করেন—কিন্তু তাঁর মনের শান্তি নষ্ট হয় না কারণ তিনি ফলের আশা করেন না। অর্জুনকে কৃষ্ণ বলছেন যে, কর্ম ত্যাগ করা নয় বরং 'আসক্তি' ত্যাগ করা হলো বীরের ধর্ম। যখন আমরা কোনো কাজ করি এবং তার ফলের সাথে নিজের সুখ-দুঃখকে জড়িয়ে ফেলি, তখনই আমরা বন্ধনে পড়ি। কিন্তু যখন আমরা ভাবি যে আমি কেবল নিমিত্ত মাত্র, তখনই আমরা কর্মযোগী হয়ে উঠি।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ পথ। সবার পক্ষে হিমালয়ে গিয়ে ধ্যান করা সম্ভব নয়, কিন্তু সবার পক্ষে 'আসক্তিহীন' হয়ে নিজের কাজ করা সম্ভব। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে যুদ্ধ করা তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম, আর সেই যুদ্ধ যদি তিনি ভগবানের নির্দেশে এবং ব্যক্তিগত ঘৃণা ছাড়া করেন, তবে তা তাঁকে পরম পদে নিয়ে যাবে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে শ্রেষ্ঠতা বাইরের পোশাকে নেই, শ্রেষ্ঠতা আছে কাজের প্রতি আমাদের মনোভাবের পবিত্রতায়। যিনি নিজের দায়িত্ব থেকে পালান না, বরং হাসিমুখে তা পালন করেন—তিনিই প্রকৃত সাধু।