॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৯ ॥

যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোঽন্যত্র লোকোঽয়ং কর্মবন্ধনঃ ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর ॥ ৩.৯ ॥

সরল ভাবার্থ

যজ্ঞের নিমিত্ত (ভগবানের প্রীতির জন্য) যে কর্ম করা হয়, তা ব্যতীত অন্য সব কর্ম এই জগৎকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। অতএব, হে কৌন্তেয়! তুমি আসক্তিহীন হয়ে সেই যজ্ঞার্থেই কর্ম সম্পাদন করো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি কর্মযোগের প্রাণভোমরা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে কর্ম কীভাবে মানুষকে বন্দি করে এবং কীভাবে মুক্ত করে। 'যজ্ঞ' শব্দের অর্থ এখানে কেবল আগুনের সামনে বসে আহুতি দেওয়া নয়, বরং 'যজ্ঞ' মানে হলো নিঃস্বার্থ সেবা বা ভগবানের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। আমরা যখন নিজের স্বার্থে কাজ করি, তখন সেই কর্ম আমাদের জালে আটকে ফেলে—যাকে বলা হয় 'কর্মবন্ধন'। কিন্তু যখন আমরা ভাবি যে এই কাজটি আমি ভগবানের জন্য করছি, তখন সেই কাজ আর আমাদের বাঁধে না।

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি যদি নিজের রাজ্য বা সুখের জন্য যুদ্ধ করো, তবে তুমি বন্ধনে পড়বে। কিন্তু যদি তুমি এই যুদ্ধকে ধর্মের রক্ষার জন্য একটি 'যজ্ঞ' হিসেবে দেখো, তবে তুমি মুক্ত হবে। 'মুক্তসঙ্গঃ' কথাটির অর্থ হলো আসক্তি ত্যাগ করা। আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ—তা সে ঘর পরিষ্কার করাই হোক বা অফিসে কাজ করাই হোক—যদি ভগবানের চরণে অর্পণ করা হয়, তবে তাই যজ্ঞে পরিণত হয়।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো জীবনকে উপাসনায় রূপান্তর করার মন্ত্র। হিন্দু ধর্মে বলা হয় জীবে দয়া, নামে রুচি। মানুষের সেবাও এক প্রকার যজ্ঞ। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে কর্মফল থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো কর্মকে যজ্ঞে পরিণত করা। যখন আমরা কোনো প্রতিদান আশা না করে কেবল কর্তব্যবোধে এবং ঈশ্বরভক্তি নিয়ে কাজ করি, তখন আমাদের কোনো পাপ স্পর্শ করতে পারে না। এটিই হলো কর্মের মুক্তি।