॥ অধ্যায় ৫, শ্লোক ১ ॥

অর্জুন উবাচ ।
সংন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগং চ শংসসি ।
যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ক্রূহি সুনিশ্চিতম্ ॥ ৫.১ ॥

সরল ভাবার্থ

অর্জুন বললেন—হে কৃষ্ণ! তুমি প্রথমে কর্মত্যাগ বা সংন্যাসের প্রশংসা করছ, আবার কর্মযোগেরও (নিষ্কাম কর্ম) প্রশংসা করছ। এখন এই দুটির মধ্যে কোনটি আমার জন্য নিশ্চিতভাবে কল্যাণকর, তা আমাকে স্পষ্টভাবে বলো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে আমাদের সাধারণ মানুষের মনের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। হিন্দু ধর্মে দুটি প্রধান ধারার কথা বলা হয়—একটি হলো 'নিবৃত্তি মার্গ' (সংসার ত্যাগ করে ধ্যানে বসা) এবং অন্যটি হলো 'প্রবৃত্তি মার্গ' (সংসারে থেকে দায়িত্ব পালন করা)।

১. অর্জুনের দ্বিধা: চতুর্থ অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেছিলেন যে জ্ঞানাগ্নিতে সব কর্ম ভস্ম হয় এবং জ্ঞানীর জন্য কোনো কর্ম বাকি থাকে না। এটি শুনে অর্জুন ভাবলেন যে সংন্যাস বা কর্ম ত্যাগই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আবার কৃষ্ণ বলছেন—'উত্তিষ্ঠ ভারত' (উঠে দাঁড়াও এবং যুদ্ধ করো)। এই আপাতবিরোধী উপদেশে অর্জুন বিভ্রান্ত। তিনি বুঝতে পারছেন না তাঁর কী করা উচিত—হিমালয়ে চলে যাওয়া নাকি যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ধরা।

২. সংন্যাস বনাম যোগ: অর্জুনের কাছে সংন্যাস মানে হলো কাজ বন্ধ করে দেওয়া। আর যোগ মানে হলো কাজ চালিয়ে যাওয়া। তাঁর প্রশ্নটি অত্যন্ত ব্যবহারিক—আমি কি সন্ন্যাসী হয়ে শান্তিতে থাকব, নাকি যোদ্ধা হয়ে রক্তপাত করব?

৩. সুনিশ্চিত উত্তরের আকাঙ্ক্ষা: অর্জুন চান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কোনো একটি নির্দিষ্ট পথ বলে দিন। মানুষের মন সবসময় একটি সহজ রাস্তা খোঁজে। আমরাও প্রায়ই ভাবি যে সবকিছু ছেড়ে দিলে হয়তো ঈশ্বর পাওয়া সহজ হবে। কিন্তু কৃষ্ণ আমাদের শেখাতে চান যে সমস্যা কাজে নয়, সমস্যা আমাদের মনে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সত্য অনুসন্ধানের পথ দেখায়। শিষ্য যখন গুরুর কাছে সন্দেহহীনভাবে প্রশ্ন করে, তখনই প্রকৃত জ্ঞান উন্মোচিত হয়। অর্জুন এখানে আদর্শ শিষ্যের মতো প্রশ্ন করেছেন যাতে কোনো প্রকার 'অস্পষ্টতা' বা 'Grey Area' না থাকে। তিনি কৃষ্ণের কাছ থেকে এমন একটি সিদ্ধান্ত চাইছেন যা তাঁকে জীবনের চরম লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে বিভ্রান্তি নিয়ে কোনো বড় কাজ করা উচিত নয়, আগে সংশয় দূর করা জরুরি।