সরল ভাবার্থ
শ্রীভগবান বললেন—সংন্যাস (কর্মত্যাগ) এবং কর্মযোগ (নিষ্কাম কর্ম) উভয়েই মোক্ষ বা পরম কল্যাণ প্রদানকারী। কিন্তু এই দুটির মধ্যে কর্মসংন্যাস অপেক্ষা 'কর্মযোগ' শ্রেষ্ঠ।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়েছেন এবং একটি বড় ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন।
১. নিঃশ্রেয়সকর বা মোক্ষদায়ক: কৃষ্ণ স্বীকার করছেন যে দুটি পথই মানুষকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। জ্ঞান মার্গ বা সন্ন্যাস কোনো ভুল পথ নয়। যদি কেউ পূর্ণ বৈরাগ্যের সাথে সংসার ত্যাগ করতে পারেন, তবে তিনি অবশ্যই ঈশ্বরকে পাবেন। কিন্তু এখানে একটি বড় 'কিন্তু' আছে।
২. কর্মযোগো বিশিষ্যতে (কর্মযোগই শ্রেষ্ঠ): ভগবান কেন কর্মকে শ্রেষ্ঠ বলছেন? কারণ মানুষের স্বভাব হলো কর্ম করা। মনকে হঠাৎ করে সব কাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং বিপজ্জনক। যারা ভেতরে কামনা রেখে বাইরে সন্ন্যাসীর বেশ ধরে, তারা ভণ্ডামিতে লিপ্ত হয়। কিন্তু কর্মযোগে মানুষ তার স্বাভাবিক কাজগুলোই করে, কেবল ফলের আশা ছাড়ে। এটি অনেক বেশি নিরাপদ এবং বাস্তবসম্মত।
৩. সহজ সাধ্যতা: সন্ন্যাস হলো পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার মতো কঠিন, যেখানে সামান্য পা পিছলে গেলেই পতন হতে পারে। অন্যদিকে কর্মযোগ হলো সমতলে হাঁটার মতো। এতে মানুষের পতন হওয়ার ভয় কম থাকে কারণ সে তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই ভগবানের সেবা করছে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি গৃহস্থ এবং সাধারণ মানুষের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন না যে তোমাকে ধ্যানে বসতে হবে; তিনি বলছেন কাজ করো, কিন্তু সেই কাজে আসক্তি রেখো না। অর্জুনকে এটি জানানো হলো যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে ক্ষত্রিয় হিসেবে যুদ্ধ করা তাঁর জন্য পালানোর চেয়েও বড় সাধনা হতে পারে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে ধর্ম কোনো বিশেষ পোশাক বা স্থানে নেই, ধর্ম আছে আমাদের কাজের ধরনে। এটি আমাদের কর্মমুখর হতে উৎসাহিত করে।