॥ অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩ ॥

জ্ঞেয়ঃ স নিত্যসংন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি ।
নির্দ্বন্দ্বো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে ॥ ৫.৩ ॥

সরল ভাবার্থ

হে মহাবাহো! যিনি কাউকে দ্বেষ (ঘৃণা) করেন না এবং কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করেন না, তাঁকে নিত্য-সংন্যাসী বলে জানবে। কারণ রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বমুক্ত ব্যক্তি অনায়াসেই সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এখানে শ্রীকৃষ্ণ 'সংন্যাসী' শব্দের এক বৈপ্লবিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে সন্ন্যাস কোনো বাহ্যিক বেশভূষা নয়, এটি হলো মনের এক শান্ত অবস্থা।

১. নিত্যসংন্যাসী: সাধারণত আমরা ভাবি যারা গেরুয়া পরেছেন তাঁরাই সন্ন্যাসী। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, যে গৃহস্থ নিজের অফিসে কাজ করছেন অথচ কারোর সাথে শত্রুতা করছেন না (ন দ্বেষ্টি) এবং ফলের লোভ করছেন না (ন কাঙ্ক্ষতি), তিনিই আসলে 'নিত্য-সংন্যাসী'। তিনি সংসারে থেকেও সন্ন্যাসী।

২. নির্দদ্বন্দ্বো (দ্বন্দ্বমুক্ত): আমাদের মন সবসময় ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্বে দোলে। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারেন যে এগুলো সব মায়া এবং তিনি শান্ত থাকেন, তখন তিনি নির্দ্বন্দ্ব হন। এই মানসিক স্থৈর্যই তাঁকে 'মহাবাহো' বা শক্তিশালী করে তোলে।

৩. সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে: এমন মানুষের জন্য মুক্তি অত্যন্ত সহজ। তাঁকে কোনো বিশেষ কঠিন যোগ করতে হয় না। তাঁর স্বাভাবিক জীবনই তাঁকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। কারণ তাঁর মনে কোনো জট নেই, কোনো পিছুটান নেই।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের অহংকার ত্যাগ করতে শেখায়। আমরা প্রায়ই ভাবি বড় কোনো কাজ করলেই বোধহয় পুণ্য হবে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তোমার মনের ভেতরের ঘৃণা আর লোভ ত্যাগ করাই হলো বড় সাধনা। অর্জুনকে তিনি বোঝাচ্ছেন—তুমি যদি তোমার আত্মীয়দের প্রতি মোহ এবং শত্রুদের প্রতি ঘৃণা ত্যাগ করে কেবল ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করো, তবে তুমি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়েই এক মহান সন্ন্যাসী হিসেবে গণ্য হবে। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরম শান্তির পথ দেখায়।