॥ অধ্যায় ৫, শ্লোক ১০ ॥

ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ ।
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা ॥ ৫.১০ ॥

সরল ভাবার্থ

যিনি সমস্ত কর্ম পরমেশ্বরে অর্পণ করেন এবং আসক্তি ত্যাগ করে কর্ম করেন, তিনি কোনো পাপে লিপ্ত হন না—ঠিক যেমন পদ্মপাতা জলে থাকলেও জল তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার অন্যতম সুন্দর ও বিখ্যাত শ্লোক। এখানে শ্রীকৃষ্ণ এক চমৎকার উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন কীভাবে এই উত্তাল সংসারে থেকেও নিষ্কলঙ্ক থাকা যায়।

১. পদ্মপত্রের উপমা: পদ্মফুল বা পদ্মপাতা কাদা জলে জন্মায়, জলেই থাকে। কিন্তু আপনি যদি ওই পাতার ওপর জল ঢালেন, জল এক ফোঁটাও আটকাবে না; তা গড়িয়ে পড়ে যাবে। তেমনি একজন কর্মযোগী সংসারের সব ঝড়-ঝাপ্টা, কাজ-কর্মের মধ্যে থাকলেও তাঁর মন থাকে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন। কোনো পাপ বা গ্লানি তাঁকে স্পর্শ করে না।

২. ব্রহ্মণ্যাধায় (ব্রহ্মে অর্পণ): কর্মযোগী তাঁর প্রতিটি কাজের ফল আগে থেকেই ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে দেন। তিনি মনে করেন—আমি ঈশ্বরের এক যন্ত্র মাত্র, তিনি যা করাচ্ছেন আমি তাই করছি। যখন কর্তৃত্ববোধ থাকে না, তখন সেই কর্মের ভালো বা মন্দ ফল ভোগ করার দায়ও তাঁর ওপর থাকে না।

৩. সঙ্গং ত্যক্ত্বা: সঙ্গ মানে হলো 'আসক্তি' বা 'অহংকার'। যখন আমরা কোনো কাজ করে ভাবি এটা আমার কৃতিত্ব, তখন আমরা সেই কাজের ফলে আবদ্ধ হই। কিন্তু আসক্তি ত্যাগ করলে মন মুক্ত হয়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে পরিবেশ কোনো সমস্যা নয়। আমরা অনেক সময় বলি—চারপাশে এত দুর্নীতি, এত অশান্তি, এখানে ভালো থাকা যায় না। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, তুমি পদ্মপাতার মতো হও। পরিবেশ যেমনই হোক, তুমি যদি তোমার ভেতরটা ভগবানে অর্পণ করে রাখো, তবে বাইরের কলুষতা তোমাকে ছুঁতে পারবে না। অর্জুনকে এটি জানানো হলো যাতে তিনি যুদ্ধের এই রক্তাক্ত পরিবেশেও নিজের পবিত্রতা বজায় রাখতে পারেন। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি প্রতিকূলতায় শান্ত থাকার এক পরম শিক্ষা।