সরল ভাবার্থ
যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা শুদ্ধ চিত্ত, যিনি দেহ ও মনকে জয় করেছেন এবং যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ বশীভূত—সেই ব্যক্তি সমস্ত প্রাণীর আত্মার সাথে নিজের আত্মাকে একীভূত অনুভব করেন। এমন ব্যক্তি কর্ম করেও তাতে লিপ্ত হন না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
একজন আদর্শ কর্মযোগীর চারটি প্রধান স্তর এখানে শ্রীকৃষ্ণ বর্ণনা করেছেন। এটি আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি 'রোডম্যাপ' বা মানচিত্র:
১. বিজিতাত্মা ও জিতেন্দ্রিয়ঃ: সাধনার প্রথম ধাপ হলো নিজের শরীর ও ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা। যদি আমাদের মন সবসময় বাইরের বিষয়ের দিকে ছোটে, তবে আমরা কোনো মহৎ কাজ করতে পারি না।
২. বিশুদ্ধাত্মা: যখন ইন্দ্রিয়গুলো শান্ত হয়, তখন মানুষের চিত্ত বা মন পরিষ্কার হয়। একেই বলা হয়েছে 'বিশুদ্ধাত্মা'। আয়নায় যেমন ধুলো থাকলে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না, তেমনি মনে কাম-ক্রোধ থাকলে ঈশ্বরের প্রতিফলন ঘটে না। শুদ্ধ মনে তখন ঈশ্বর দর্শন সম্ভব হয়।
৩. সর্বভূতাত্মভূতাত্মা: এটি কর্মযোগের সর্বোচ্চ স্তর। এখানে সাধক বুঝতে পারেন যে আমার ভেতরে যে আত্মা আছে, ওই পিঁপড়েটির ভেতরেও সেই একই আত্মা বিরাজমান। যখন তিনি সবার সাথে নিজেকে এক মনে করেন, তখন তাঁর পক্ষে কাউকেও ঘৃণা করা বা কারোর প্রতি হিংসা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি সবাইকে ভালোবাসেন কারণ তিনি সবার মাঝে নিজেকেই দেখেন।
৪. ন লিপ্যতে: এমন মানুষ যখন কোনো কাজ করেন, তখন সেই কাজ তাঁকে আবদ্ধ করে না। তিনি কাজ করেন এক বিশাল বড় যজ্ঞের অংশ হিসেবে। তাঁর কাছে নিজের স্বার্থ বলে কিছু থাকে না।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সংকীর্ণতা দূর করতে শেখায়। আমরা যখন নিজেকে বড় মনে করি এবং অন্যকে ছোট ভাবি, তখনই আমরা অশান্ত হই। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সব প্রাণীর সাথে একাত্মতা অনুভব করাই হলো প্রকৃত শান্তি। অর্জুনকে এটি জানানো হলো যাতে তিনি এই যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়েও সবার প্রতি মমতা ও কর্তব্যের ভারসাম্য রাখতে পারেন। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজকে পবিত্র ও নিঃস্বার্থ করার পথ দেখায়।