সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ ।
সংপ্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্ ॥ ৬.১৩ ॥
প্ৰশান্তাত্মা বিগতভীৰ্ব্ৰহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ ।
মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপরঃ ॥ ৬.১৪ ॥
সরল ভাবার্থ:
দেহ, মাথা ও ঘাড় সোজা ও অটল রেখে স্থিরভাবে বসতে হবে। অন্য দিকে না তাকিয়ে কেবল নিজের নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। শান্ত মনে, ভয়হীন হয়ে আমাকেই পরম লক্ষ্য জ্ঞান করে আমার চিন্তায় মগ্ন হতে হবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এখানে শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানের সঠিক শারীরিক মুদ্রা (Posture) এবং মানসিক সংকল্পের এক বৈজ্ঞানিক বিবরণ দিয়েছেন। শরীর ও মনের এই মেলবন্ধনই ধ্যানের সাফল্যের চাবিকাঠি।
১. যোগমুদ্রার গুরুত্ব: 'সমং কায়শিরোগ্রীবং'—মেরুদণ্ড, মাথা ও ঘাড় সোজা রাখা অত্যন্ত জরুরি। এটি করলে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে এবং মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। শরীর যদি কুঁজো হয়ে থাকে, তবে অলসতা বা নিদ্রা আসার সম্ভাবনা থাকে। অটল ও স্থির হয়ে বসা মানে হলো শরীরের দিক থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়া যাতে মন শরীরের অস্থিরতায় বিভ্রান্ত না হয়। এরপর বলা হয়েছে 'নাসিকাগ্রং সংপ্রেক্ষ্য'—অর্থাৎ দৃষ্টিকে চারদিকে ছড়িয়ে না দিয়ে নিজের নাসিকার অগ্রভাগে বা ভ্রু-যুগলের মাঝে নিবদ্ধ করা। এটি চোখের পেশিকে আরাম দেয় এবং মনকে একমুখী করতে সাহায্য করে।
২. ভয়হীনতা ও ব্রহ্মচর্য: মানসিক স্তরে যোগীকে হতে হবে 'প্রশান্তাত্মা' ও 'বিগতভীঃ'। ভয় হলো আধ্যাত্মিকতার পথে সবচেয়ে বড় দেয়াল। যখন মানুষ বুঝতে পারে সে ঈশ্বরের অংশ, তখন তাঁর আর কোনো মৃত্যুভয় বা জগতের ভয় থাকে না। 'ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ' শব্দের অর্থ কেবল কাম দমন নয়, বরং ব্রহ্মের চরণে চরাই হলো ব্রহ্মচর্য। জীবনের প্রতিটি স্তরে পবিত্রতা ও সত্য বজায় রাখা ধ্যানের জন্য অপরিহার্য। অপবিত্র মনে ঈশ্বরচিন্তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করলে যে ওজঃ শক্তি জন্মায়, তা ধ্যানের গভীরতায় যাওয়ার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
৩. মচ্চিত্তো ও মৎপরঃ: শ্লোকের শেষে শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানের প্রাণভোমরা বলে দিয়েছেন। মনকে কেবল সংযত করলে চলবে না, তাকে সঠিক লক্ষ্যে নিয়োগ করতে হবে। সেই লক্ষ্য হলো শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। 'মচ্চিত্তো' মানে যাঁর মন আমাতে নিমগ্ন, আর 'মৎপরঃ' মানে যিনি আমাকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ গতি বা লক্ষ্য মনে করেন। মনের স্বভাব হলো কোনো না কোনো বিষয়কে আঁকড়ে ধরা। যদি সে জাগতিক বিষয় না পায়, তবে সে অশান্ত হয়। তাই মনকে ঈশ্বরের দিব্য গুণাবলী ও নামের সাথে যুক্ত করে দিতে হয়। এভাবেই মন ধীরে ধীরে লয়প্রাপ্ত হয় এবং পরম শান্তি লাভ করে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকগুলো আমাদের শেখায় যে সঠিক ভঙ্গিমা এবং পবিত্র সংকল্প ছাড়া আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এটি এক প্রকারের আত্মিক ইঞ্জিনিয়ারিং যেখানে শরীরকে যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মনকে পরম সত্যের সাথে টিউন করা হয়। এটি মানুষকে ধীর-স্থির ও সংকল্পবদ্ধ হতে শেখায়।