॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ১৫ ॥

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী নিয়তমাসঃ ।
শান্তিং নিৰ্বাণপৰমাং মৎসংস্থামধিগচ্ছতি ॥ ৬.১৫ ॥

সরল ভাবার্থ:

এইভাবে নিয়মিত অভ্যাস করে সংযত মনের যোগী আমার স্বরূপে অবস্থিত পরম শান্তি ও মুক্তি লাভ করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি হলো ধ্যানের এই সম্পূর্ণ আলোচনার এক মহিমান্বিত উপসংহার। শ্রীকৃষ্ণ এখানে আশ্বস্ত করেছেন যে এই পথে চললে মানুষ শেষ পর্যন্ত কী লাভ করবে।

১. অভ্যাসের সাতত্য ও শৃঙ্খলা: 'সদা' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগ বা ধ্যান কোনো এক দিনের চটকদার বিষয় নয়। এটি একটি লাইফস্টাইল। যখন কোনো ব্যক্তি নিয়মিত নিজের মনকে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেন, তখনই তাঁর মনের ময়লা দূর হয়। 'নিয়তমানসঃ' মানে যাঁর মন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বুনো ঘোড়াকে যেমন পিঠে চড়ার যোগ্য করতে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, অবাধ্য মনকেও ধ্যানের যোগ্য করতে দীর্ঘকালীন অভ্যাসের প্রয়োজন। এই নিরন্তর প্রচেষ্টাই একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণ যোগীতে রূপান্তরিত করে।

২. শান্তিং নিৰ্বাণপৰমাং: নির্বাণ মানে হলো ক্ষুদ্র অহংকার ও কামনার বিনাশ। আমাদের মনের অশান্তির মূলে রয়েছে 'আমি ও আমার' এই ধারণা। যখন ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে যে সে এই নশ্বর শরীর নয়, সে অবিনাশী আত্মা—তখন তাঁর সব দুঃখের অবসান ঘটে। এই শান্তি কোনো জাগতিক সুখের মতো সাময়িক নয়। জগত ধ্বংস হলেও এই শান্তি অবিনাশী থাকে। এটি এক আনন্দময় অবস্থা যেখানে কোনো প্রকারের দাহ বা যন্ত্রণা থাকে না। এটিই হলো মানব জীবনের পরম লক্ষ্য যা প্রতিটি ধর্মতত্ত্বের মূল কথা।

৩. মৎসংস্থাম (ঈশ্বরে স্থিতি): প্রকৃত শান্তি কেবল আমার (ঈশ্বরের) ভেতরেই আছে। ভগবান বলছেন—শান্তি বাইরে কোথাও নেই, তা আমার চরণে বা আমার স্মরণে। যখন যোগী আমাতে লীন হন, তখনই তিনি পরম আনন্দ পান। ঈশ্বর এবং ভক্ত যখন এক হয়ে যান, তখন সেখানে কোনো বিভেদ থাকে না। এই অবস্থাই হলো মোক্ষ বা মুক্তি। জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে বেরিয়ে এসে ঈশ্বরের নিত্য ধামে বাস করাই হলো ধ্যানের চূড়ান্ত সার্থকতা। এই শ্লোকটি আমাদের হতাশ না হওয়ার এবং ধৈর্য ধরে সাধনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের মোক্ষ বা মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের সব সংগ্রাম ও পরিশ্রমের শেষ লক্ষ্য হলো অন্তরের পরম শান্তি। যখন আমরা বাহ্যিক জগতের চাকচিক্য ছেড়ে অন্তরের গভীরে প্রবেশ করি, তখনই আমরা সেই অটল আশ্রয়ের সন্ধান পাই যা আমাদের শাশ্বত মুক্তি দান করে।