॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ১৬ ॥

নাত্যন্ততস্তু যোগোঽস্তি ন চৈকান্তমনশতঃ ।
ন চাতিলোকস্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জুন ॥ ৬.১৬ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে অর্জুন! যিনি খুব বেশি আহার করেন অথবা একেবারেই আহার করেন না, যিনি খুব বেশি ঘুমান অথবা একেবারেই ঘুমান না—তাঁর যোগ বা ধ্যান সিদ্ধ হয় না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি আধ্যাত্মিক সাধনার এক অত্যন্ত বাস্তববাদী ও বৈজ্ঞানিক দিক নির্দেশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে এবং আমাদের সবাইকে শেখাচ্ছেন যে, ঈশ্বর লাভের পথ কোনো প্রকার 'চরমপন্থা' বা 'Extreme' আচরণের পথ নয়। রচনার মতো গভীরতা দিয়ে বিচার করলে আমরা এর নিগূঢ় সত্যগুলো এভাবে দেখতে পারি:

১. আহারের পরিমিতি: মানুষের শরীর হলো একটি মন্দিরের মতো, আর এই মন্দিরকে সচল রাখতে আহারের প্রয়োজন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'নাত্যন্ততস্তু'—অর্থাৎ অতিভোজন ধ্যানের শত্রু। অতিরিক্ত আহার করলে শরীরে তন্দ্রা, আলস্য এবং জড়তা আসে। পেট ভরে খেলে রক্ত সঞ্চালন পাকস্থলীর দিকে বেশি থাকে, ফলে মস্তিষ্ক শান্ত হয়ে ধ্যানে বসতে পারে না। অন্যদিকে, যারা একেবারে না খেয়ে থাকার মতো কঠোরতা দেখান, তাদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষুধার জ্বালায় মন তখন কেবল খাবারের চিন্তাই করতে থাকে, ঈশ্বরের চিন্তায় নয়। তাই শরীরকে এমন অবস্থায় রাখতে হবে যাতে সে ধ্যানের পথে বাধা না হয়ে বরং সহায়ক হয়।

২. নিদ্রা ও জাগরণের ভারসাম্য: ঘুমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। যারা সারাদিন ঘুমান, তাদের বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে যায় এবং তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন থাকে। আবার যারা আধ্যাত্মিকতা দেখানোর জন্য রাত জেগে থাকেন, তাদের স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম উত্তেজিত হয়ে পড়ে। অনিদ্রা মনকে অস্থির করে তোলে। ভগবান এখানে পরিষ্কার করেছেন যে, আধ্যাত্মিক জীবন মানে শরীরকে অত্যাচার করা নয়। শরীর হলো পরমাত্মার বাসস্থান, তাই একে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা সাধকের অন্যতম দায়িত্ব।

৩. সহজ সাধনা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে ধর্মের এক মানবিক রূপ তুলে ধরেছেন। সাধনা মানে এই নয় যে আপনাকে লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে অনাহারে থাকতে হবে। বরং নিজের প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাসগুলোকে শৃঙ্খলায় আনাই হলো যোগ। মানুষের অভ্যাস যখন অনিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সে প্রকৃতির দাসে পরিণত হয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় কীভাবে ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে আধ্যাত্মিকতার যোগ্য করে তোলা যায়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের 'মধ্যপন্থা'র গুরুত্ব শেখায়। আমরা যখন জীবনের প্রতিটি কাজ—খাওয়া, শোয়া বা কাজ করা—সঠিক মাত্রায় করি, তখনই আমাদের জীবনীশক্তি রক্ষা পায়। এই রক্ষা করা শক্তিই পরে ধ্যানের সময় আমাদের চেতনার গভীর স্তরে নিয়ে যায়। এটি একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন দর্শনের ভিত্তি।