॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ১৭ ॥

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু ।
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ॥ ৬.১৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

যাঁঁর আহার ও বিহার (ভ্রমণ/বিনোদন) নিয়মিত, যাঁর কর্মচেষ্টা নিয়মিত এবং যাঁর ঘুম ও জাগরণ নিয়মিত—তাঁর যোগই সমস্ত জাগতিক দুঃখ বিনাশ করে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

আগের শ্লোকের পরিপূরক হিসেবে এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সার্থক যোগের চূড়ান্ত সূত্র দিয়েছেন। এটি আধ্যাত্মিক রচনার এক অনন্য অধ্যায় হতে পারে যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

১. যুক্ত আহার ও বিহার: 'যুক্ত' শব্দটির অর্থ হলো সুসংগত বা ব্যালেন্সড। বিহার মানে হলো ইন্দ্রিয়গুলোর বিচরণ। আমরা কী দেখছি, কী শুনছি বা কার সাথে মেলামেশা করছি—এই সবকিছুই বিহারের অন্তর্গত। একজন সাধক কেবল তাঁর খাবার নিয়ন্ত্রণ করেন না, তিনি তাঁর চারপাশের পরিবেশ এবং সঙ্গও নির্বাচন করেন সুশৃঙ্খলভাবে। যখন আমাদের দেখা বা শোনা ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়, তখন বিনোদনও সাধনায় রূপান্তরিত হয়। এই শৃঙ্খলাই মনকে বিষয়ের ঘাত-প্রতিঘাত থেকে রক্ষা করে।

২. কর্ম ও চেষ্টার ভারসাম্য: শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেননি যে যোগী হতে হলে কাজ ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বলেছেন 'যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু'—অর্থাৎ কর্মে যেন সঠিক প্রচেষ্টা থাকে। অনেকে আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে আলস্য করেন, আবার অনেকে ফলের আশায় উন্মাদের মতো কাজ করে নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলেন। যোগী এই দুইয়ের মাঝখানে অবস্থান করেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত হন না। এই নিরাসক্ত কর্মই তাঁর স্নায়ুকে শান্ত রাখে এবং ধ্যানে বসার সময় তাঁকে প্রশান্তি দান করে।

৩. দুঃখহা যোগ: এই শ্লোকের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হলো 'যোগো ভবতি দুঃখহা'। অর্থাৎ এই নিয়মিত জীবনযাপনের মাধ্যমে যে যোগ সাধিত হয়, তা মানুষের সমস্ত জাগতিক ও আধ্যাত্মিক দুঃখের যম। মানুষের অধিকাংশ মানসিক রোগের কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত জীবন। যখন আমরা প্রকৃতির নিয়মে শরীর ও মনকে বাঁধি, তখন আমাদের ভেতরে এক দিব্য আনন্দ জন্ম নেয়। এই আনন্দই আমাদের দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জীবনবিমুখতা নয়, বরং জীবনকে ঈশ্বরমুখী করাই হলো যোগ। এটি আমাদের বর্তমান যুগের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের কাজের ব্যস্ততা, খাবারের অনিয়ম এবং ঘুমের অভাবই আমাদের অশান্তির মূল কারণ। শ্রীকৃষ্ণের এই উপদেশ মেনে চললে কেবল যোগী নয়, যে কোনো সাধারণ মানুষও রোগমুক্ত ও শান্ত জীবন যাপন করতে পারে। এটিই হলো প্রকৃত আত্মিক বিজ্ঞান।