॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ১৮ ॥

যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে ।
নিঃস্পৃহঃ সর্বকামেভ্য যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা ॥ ৬.১৮ ॥

সরল ভাবার্থ:

যখন বিশেষরূপে নিয়ন্ত্রিত চিত্ত কেবল আত্মাতেই স্থির হয় এবং সমস্ত জাগতিক কামনা থেকে সম্পূর্ণ নিঃস্পৃহ হয়, তখনই সেই ব্যক্তিকে যোগে যুক্ত বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি যোগীর মানসিক উচ্চতা এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পূর্ণতার এক গভীর বর্ণনা দেয়। এখানে শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানের একটি চূড়ান্ত সংজ্ঞাও দিয়েছেন।

১. বিনিয়ত চিত্ত ও আত্মার স্থিতি: 'বিনিয়তং চিত্তম' মানে এমন মন যা কেবল বাইরে থেকে নয়, বরং ভেতর থেকেও সম্পূর্ণ শান্ত। সাধারণ মানুষের মন সর্বদা বাইরের জগতের চিন্তা, অতীতে শোক বা ভবিষ্যতের উদ্বেগে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যোগীর মন এই সব বিক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে 'আত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে'—অর্থাৎ নিজের ভেতরে থাকা পরমাত্মাতে স্থির হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে আনন্দ বাইরে নেই, আনন্দ তাঁর নিজের ভেতরেই। এই উপলব্ধি যখন স্থায়ী হয়, তখন তাঁর মন আর বাইরের বিষয়ের দিকে ছুটে যায় না।

২. নিঃস্পৃহ ও নিষ্কাম অবস্থা: কামনাই হলো মনের চঞ্চলতার মূল কারণ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'নিঃস্পৃহঃ সর্বকামেভ্য'। এর মানে এই নয় যে যোগীর কোনো ইচ্ছা নেই, বরং এর অর্থ হলো জাগতিক বস্তু তাঁকে আর সুখী বা দুঃখী করতে পারে না। তিনি জগতের সবকিছু ব্যবহার করেন কিন্তু কোনো কিছুর ওপর তাঁর মায়া থাকে না। যখন মন বুঝতে পারে যে আত্মার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই, তখন অন্য সব সম্পদ তাঁর কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এই আকাঙ্ক্ষাহীন অবস্থাই হলো ধ্যানের সার্থকতা।

৩. যোগের প্রকৃত লক্ষণ: আমরা অনেকেই ভাবি যে শরীরে যোগব্যায়াম করাই হলো যোগ। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে যোগের এক উচ্চতর সংজ্ঞা দিয়েছেন। যখন মন কোনোভাবেই বিচলিত হয় না এবং নিজের কেন্দ্রে স্থির থাকে, তখনই তাকে 'যুক্ত' বলা হয়। এই যুক্ত হওয়া মানে পরমাত্মার সাথে একীভূত হওয়া। এই অবস্থায় যোগী তাঁর অস্তিত্বকে ঈশ্বরের ইচ্ছার সাথে মিশিয়ে দেন।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মনের শান্তি হলো আমাদের প্রকৃত সম্পদ। আমরা বাইরে থেকে অনেক কিছু অর্জন করতে পারি, কিন্তু যদি মন নিজের ভেতরে স্থির না থাকে তবে সব প্রাপ্তি বৃথা। এই শ্লোকটি আমাদের আত্মানুসন্ধানের পথে চলতে এবং জাগতিক তুচ্ছ বিষয়ের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করে। এটিই হলো মোক্ষ বা মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ।