॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ১৯ ॥

যথো দীপো নিবাতস্থো নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা ।
যোগিনো যতচিত্তস্য যুঞ্জতো যোগমাত্মনঃ ॥ ৬.১৯ ॥

সরল ভাবার্থ:

বায়ুশূন্য স্থানে প্রদীপের শিখা যেমন কম্পিত হয় না, যোগ অভ্যাসে যুক্ত সংযত চিত্তের উপমাও ঠিক তেমনি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপমা। একজন যোগীর মন কতটা স্থির ও অটল হতে পারে, তা বোঝাতে শ্রীকৃষ্ণ প্রদীপের শিখার সাহায্য নিয়েছেন।

১. প্রদীপের শিখার উপমা: প্রদীপের শিখা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য বাতাস লাগলেই তা কাঁপতে থাকে। এখানে প্রদীপের শিখা হলো আমাদের 'চেতনা' বা 'মন', আর বাতাস হলো আমাদের 'জাগতিক কামনা' ও 'বিক্ষেপ'। আমরা যখন ধ্যানে বসার চেষ্টা করি, তখন হাজারো স্মৃতি বা দুশ্চিন্তার হাওয়া আমাদের মনকে কাঁপিয়ে দেয়। ফলে ধ্যানের আলো স্থির হতে পারে না। কিন্তু যোগী যখন তাঁর চারপাশের কামনার বাতাসকে রোধ করতে পারেন (নিবাতস্থ), তখন তাঁর মন ঠিক প্রদীপের শিখার মতো সোজা এবং স্থির হয়ে যায়।

২. যতচিত্তের একমুখিতা: 'যতচিত্তস্য' মানে যাঁর মন সম্পূর্ণ বশীভূত। এমন যোগীর চিন্তা সোজা ব্রহ্মের দিকে ধাবিত হয়। প্রদীপের শিখা যেমন অন্ধকারের বিনাশ করে, যোগীর এই স্থির মনও তাঁর ভেতরের অজ্ঞানতাকে নাশ করে। এই অবস্থায় মনের কোনো অস্থিরতা থাকে না, কেবল এক গভীর প্রশান্তি বিরাজ করে। এটিই হলো ধ্যানের সেই গভীর স্তর যেখানে সাধক কেবল তাঁর আরাধ্য দেবতাকে বা পরমাত্মাকেই দর্শন করেন।

৩. স্থিরতার মাহাত্ম্য: এই শ্লোকটি আমাদের একাগ্রতার গুরুত্ব শেখায়। মন স্থির না হলে কোনো জ্ঞানই স্থায়ী হয় না। যোগী যখন তাঁর মনকে আত্মার জ্যোতিতে স্থির করেন, তখন তিনি সেই পরম আলোর সাক্ষাৎ পান। এটি কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, জীবনের যে কোনো কঠিন কাজে সাফল্যের জন্য এই একাগ্রতা একান্ত প্রয়োজন। যার মন কাঁপছে না, তাঁর পক্ষেই সম্ভব জগতকে জয় করা।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সাধনার লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত মনের এই কম্পন বন্ধ করা। যখন আমরা রাগ, দ্বেষ ও মোহের বাতাস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারব, তখনই আমাদের হৃদয়ে ঈশ্বরের আলো চিরস্থায়ীভাবে জ্বলবে। এই উপমাটি প্রতিটি সাধকের জন্য এক ধ্রুবতারা স্বরূপ।