যত্রোপরমতে চিত্তং নিরুদ্ধং যোগসেবয়া ।
যত্র চৈবাত্মনাত্মানং পশ্যন্নাত্মনি তুষ্যতি ॥ ৬.২০ ॥
সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্বুদ্ধিগ্ৰাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্ ।
বেত্তি যত্র ন চৈবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ ॥ ৬.২১ ॥
যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ ।
যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে ॥ ৬.২২ ॥
তং বিদ্যাদ্ দুঃখসংযোগবিয়োগং যোগসংজ্ঞিতম্ ।
স নিশ্চয়েন যোদ্ধব্যো যোগোঽনির্বিঘ্নচেতসা ॥ ৬.২৩ ॥
সরল ভাবার্থ:
যোগ অভ্যাসের ফলে যখন চিত্ত সম্পূর্ণ শান্ত হয়, যখন সাধক শুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা আত্মাকে দর্শন করে পরম তৃপ্তি পান; যখন তিনি সেই ইন্দ্রিয়-অতীত পরম সুখ অনুভব করেন এবং সেখান থেকে কক্ষনো বিচ্যুত হন না; যা পাওয়ার পর তিনি অন্য কোনো লাভকে তার চেয়ে বড় মনে করেন না এবং যেখানে স্থির থাকলে অতি বড় দুঃখেও তিনি বিচলিত হন না—সেই অবস্থাকেই যোগ বলা হয়। দুঃখের সাথে সংযোগের বিচ্ছেদকেই যোগ বলে জানতে হবে। এই যোগ অতি উৎসাহ ও ধৈর্যের সাথে অভ্যাস করা উচিত।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই চারটি শ্লোককে একত্রে বলা যেতে পারে 'যোগের পরম সার্থকতা ও সজ্ঞাসূত্র'। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ধ্যানের সেই চূড়ান্ত স্তরের কথা বলেছেন যা লাভ করলে মানুষের আর কিছুই চাওয়ার থাকে না। রচনার মতো বিস্তারিতভাবে একে বিশ্লেষণ করলে আমরা জীবনের শ্রেষ্ঠ দর্শনের দেখা পাই।
১. চিত্ত নিবৃত্তি ও আত্মদর্শন: ২০ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে যে যোগ অভ্যাসের মাধ্যমে মন যখন জগতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় (নিরুদ্ধং চিত্ত), তখন সে নিজের ভেতরে থাকা 'পরমাত্মা'র সাক্ষাৎ পায়। এই দর্শন কোনো কাল্পনিক দর্শন নয়, এটি হলো এক গভীর অনুভব। এই অনুভবের পর মানুষ নিজের ভেতরেই এক অসীম তৃপ্তি লাভ করে (আত্মনি তুষ্যতি)। সাধারণ মানুষের সুখ সবসময় অন্যের ওপর বা বাইরের কোনো বস্তুর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যোগীর সুখ তাঁর নিজের আত্মার ওপর নির্ভরশীল। এই স্বাবলম্বী আনন্দই তাঁকে চিরস্থায়ী শান্তি দান করে।
২. অতীন্দ্রিয় সুখের আস্বাদ: ২১ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এক বিশেষ সুখের কথা বলেছেন যা আমাদের চোখ, কান বা জিভ দিয়ে অনুভব করা যায় না। এটি হলো 'বুদ্ধিগ্ৰাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্' সুখ। এর অর্থ হলো শুদ্ধ বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবনযোগ্য এক আনন্দ। জগতের সব সুখ হলো শরীরের মাধ্যমে আসা সুখ যা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আত্মার সুখ হলো শাশ্বত। এই সুখের স্বাদ একবার যিনি পেয়েছেন, তিনি জগতের সমস্ত হীরা-জহরতকেও ধুলোর মতো মনে করেন। তিনি একবার সেই সত্যের ওপর স্থির হলে আর সেখান থেকে বিচ্যুত হন না।
৩. পরম লাভ ও অজেয় শক্তি: ২২ নম্বর শ্লোকের ব্যাখ্যা আমাদের জীবনের বড় বড় আঘাত সহ্য করার শক্তি দেয়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই আত্মিক আনন্দ পাওয়ার পর মানুষ অন্য কোনো লাভকে আর বড় মনে করে না। এমনকি জীবনে যখন পাহাড়সম দুঃখ নেমে আসে (গুরুণাপি দুঃখেন), তখনও সেই ব্যক্তি পাহাড়ের মতো অটল থাকেন। তাঁর মনে কোনো ভয় বা বিচলন থাকে না। এটিই হলো আধ্যাত্মিকতার চরম বিজয়। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের সত্যিকারের জয় হলো মনের সেই অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে বাইরের কোনো বিপর্যয় আমাদের ভেতরকে স্পর্শ করতে পারবে না।
৪. দুঃখের সাথে বিচ্ছেদই যোগ: ২৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যোগের এক বৈপ্লবিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। আমরা সাধারণত যোগ মানে 'মিলন' বুঝি। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন—যোগ মানে হলো 'দুঃখের সাথে বিচ্ছেদ'। আমরা যখন মায়ার সাথে বা জাগতিক বস্তুর সাথে যুক্ত হই, তখন দুঃখের সাথে আমাদের মিলন হয়। আর যখন আমরা ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হই, তখন দুঃখের সাথে আমাদের চিরবিচ্ছেদ ঘটে। এই যোগ অভ্যাস করতে হবে অত্যন্ত সংকল্প ও ধৈর্যের সাথে। পথে অনেক বাধা আসবে, মন বারবার নিরাশ হবে, কিন্তু দমে যাওয়া চলবে না। এই অটল প্রচেষ্টাই মানুষকে মোক্ষের পথে নিয়ে যায়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকগুলো আমাদের জীবনের পরম আশ্রয়ের কথা বলে। এটি আমাদের আশ্বস্ত করে যে আমাদের ভেতরে এমন এক শক্তির উৎস আছে যা জাগতিক কোনো কিছু দিয়ে মাপা যায় না। এটি আমাদের সাহসের সাথে জীবন পরিচালনা করতে শেখায় এবং মনে করিয়ে দেয় যে দুঃখ চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু আত্মিক আনন্দ চিরস্থায়ী।