সঙ্কল্পপ্রভবান্ কামান ত্যক্ত্বা সর্বানশেষতঃ ।
মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ ॥ ৬.২৪ ॥
সরল ভাবার্থ:
সংকল্প থেকে উৎপন্ন সমস্ত কামনাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করে এবং মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়সমূহকে সব দিক থেকে সংযত করে ধীরভাবে ধ্যানে অগ্রসর হতে হবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই শ্লোকটি ধ্যানের পথে সবচেয়ে বড় শত্রু—'কামনা' ও 'সংকল্প'কে ধ্বংস করার এক নিগূঢ় কৌশল বর্ণনা করে। এটি সাধকের জন্য এক চূড়ান্ত রণনীতি।
১. সংকল্প ও কামনার যোগসূত্র: শ্রীকৃষ্ণ এখানে কামনার জন্মরহস্য উন্মোচন করেছেন। আমরা কোনো বস্তুর কথা বারবার চিন্তা করি (সংকল্প), আর তা থেকেই সেই বস্তুকে পাওয়ার ইচ্ছা বা কামনা জন্মায়। তাই কামনার মূলে কুঠারাঘাত করতে হলে সংকল্প ত্যাগ করতে হবে। 'সর্বানশেষতঃ' শব্দটি দিয়ে কৃষ্ণ বুঝিয়েছেন যে কোনো একটি বা দুটি কামনা নয়, বরং হৃদয়ের গহীন কোণে থাকা সূক্ষ্ম বাসনাগুলোকেও সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এই ত্যাগই মনকে ধ্যানের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
২. ইন্দ্রিয় সংযম: ইন্দ্রিয়গুলো হলো বুনো ঘোড়ার মতো, যারা সব সময় বাইরের বিষয়ের দিকে দৌড়াতে চায়। কৃষ্ণ বলছেন 'মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং'—অর্থাৎ মনরূপ লাগাম দিয়ে এদেরকে টেনে ধরতে হবে। কেবল শরীর দিয়ে নিজেকে ঘরে আটকে রাখলে হবে না, মনকেও বশীভূত করতে হবে। আমাদের চোখ যা দেখছে বা কান যা শুনছে, তার ওপর যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে ধ্যান কখনো সফল হবে না। এই সংযমই সাধককে বাইরের জগত থেকে গুটিয়ে এনে অন্তর্জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
৩. মানসিক শৃঙ্খলা: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মনের চেয়ে শক্তিশালী কোনো অস্ত্র নেই। আমরা যদি মনকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তবে অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। কামনা হলো একটি আগুনের মতো, যা ভোগের ঘি ঢাললে আরও বেশি জ্বলে ওঠে। যোগী সেই আগুনেই বৈরাগ্যের জল ঢেলে তা নির্বাপিত করেন। এটিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা—বিষয়ের দাসত্ব থেকে মুক্তি।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের পবিত্রতার পথ দেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের মনের সংকল্পই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যখন আমাদের সংকল্প হয় কেবল পরমাত্মার প্রতি, তখন জাগতিক তুচ্ছ কামনাগুলো নিজে থেকেই ঝরে পড়ে। এই নিষ্কাম অবস্থাই হলো ঈশ্বরের চরণে পৌঁছানোর প্রধান সোপান।