শনৈঃ শনৈরুপরমেদ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া ।
আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েত ॥ ৬.২৫ ॥
সরল ভাবার্থ:
ধীরে ধীরে বুদ্ধিকে ধৈর্যের সাথে ধরে রেখে মনকে আত্মাতে স্থির করতে হবে এবং অন্য কোনো জাগতিক চিন্তা করা চলবে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এটি ধ্যানের অভ্যাসের চূড়ান্ত পর্যায়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অত্যন্ত মমতার সাথে একজন সাধককে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছেন।
১. শনৈঃ শনৈঃ বা ধৈর্যের মহিমা: শ্রীকৃষ্ণ জানেন যে ধ্যানে বসামাত্রই মন শান্ত হবে না। তাই তিনি বলছেন 'শনৈঃ শনৈঃ'—অর্থাৎ ধীরে ধীরে। আধ্যাত্মিকতা কোনো জাদুকরী বিষয় নয় যে আজই বসলাম আর আজই ঈশ্বরকে পেয়ে গেলাম। এটি এক দীর্ঘকালীন সাধনা। বুনো ঘোড়াকে বশ করতে যেমন সময় লাগে, অবাধ্য মনকে আত্মার দিকে ফেরাতেও তেমনি ধৈর্যের প্রয়োজন। এই ধৃতি বা ধৈর্যই হলো সাধকের সবচেয়ে বড় গুণ। নিরাশ না হয়ে বারবার চেষ্টা করাই হলো সাফল্যের চাবিকাঠি।
২. বুদ্ধির শাসন: ধ্যানে মনকে স্থির করার জন্য বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে হয়। বুদ্ধি যখন বুঝতে পারে যে জাগতিক বস্তু তুচ্ছ আর আত্মা হলো পরম সত্য, তখনই সে মনকে শাসন করতে পারে। 'আত্মসংস্থং মনঃ' করার অর্থ হলো মনকে নিজের কেন্দ্রের দিকে নিয়ে আসা। আমরা সাধারণত অন্যের কথা বা বাইরের ঘটনার কথা চিন্তা করি, কিন্তু যোগী কেবল নিজের আত্মার জ্যোতিতে মনকে নিমজ্জিত রাখেন।
৩. চিন্তাশূন্য অবস্থা: 'ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েত'—এর অর্থ হলো কোনো প্রকার জাগতিক চিন্তা মনে ঠাঁই না দেওয়া। মন যখন সম্পূর্ণ শূন্য হয়, তখনই সেখানে পরমাত্মার প্রকাশ ঘটে। এটি এক গভীর স্তব্ধতা যা শব্দাতীত। এই স্তব্ধতাই হলো সৃষ্টির আদি উৎস। এই অবস্থায় পৌঁছালে সাধক অনুভব করেন যে তিনি একা নন, বরং তিনি সমগ্র বিশ্বের সাথে একাত্ম। এটিই হলো চরম প্রাপ্তি।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের পরম শান্তির পথ দেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের সব অশান্তির কারণ হলো এই অতিরিক্ত চিন্তা। যখন আমরা মনকে আত্মাতে স্থির করতে শিখব, তখনই আমরা জীবনের প্রকৃত আনন্দ পাব। এই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার উপদেশ আমাদের হতাশ হতে দেয় না এবং আমাদের আধ্যাত্মিক যাত্রাকে সুনিশ্চিত করে।