॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ২৬ ॥

যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরম্ ।
ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ ॥ ৬.২৬ ॥

সরল ভাবার্থ:

চঞ্চল ও অস্থির মন যে যে কারণে বা যে যে বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় থেকে মনকে ফিরিয়ে এনে বারবার কেবল আত্মাতেই স্থির করতে হবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি প্রত্যেক সাধকের জন্য এক সঞ্জীবনী মন্ত্র। ধ্যানে বসলে মন কেন স্থির হতে চায় না এবং তখন কী করা উচিত, শ্রীকৃষ্ণ এখানে তার এক অত্যন্ত ব্যবহারিক সমাধান দিয়েছেন।

১. মনের স্বভাবজাত চঞ্চলতা: 'চঞ্চলমস্থিরম্'—এই দুটি শব্দ দিয়ে কৃষ্ণ মনের প্রকৃত স্বরূপ বুঝিয়ে দিয়েছেন। মন হলো বাতাসের মতো, যাকে ধরে রাখা কঠিন। আমরা যখনই চোখ বন্ধ করি, মন আমাদের পুরনো স্মৃতি, ভবিষ্যতের চিন্তা বা নানা রকম কামনার রাজ্যে নিয়ে যায়। এটি মনের ধর্ম। সাধককে বুঝতে হবে যে মন অবাধ্য হবেই, এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতন থাকা। মন যখনই কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করবে, তখনই বুঝতে হবে যে সে বিপথে যাচ্ছে।

২. ফিরে আসার কৌশল: শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন না যে মনকে একবারে বেঁধে ফেলো। তিনি বলছেন 'যতো যতো... ততস্ততো'। অর্থাৎ মন যতবার পালাবে, ততবার তাকে ধরে আনতে হবে। এটি একটি যুদ্ধের মতো। মন কোনো প্রিয় খাবারের কথা ভাবলে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনতে হবে। মন কোনো শত্রুর কথা ভাবলে তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই বারবার ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটিই হলো প্রকৃত অভ্যাস। একে 'প্রত্যাহার' বলা হয়। আমরা যখন বারবার মনকে অবাধ্য হতে দেব না, তখন ধীরে ধীরে সে ক্লান্ত হয়ে আমাদের কথা শুনতে শুরু করবে।

৩. আত্মায় বশীকরণ: মনকে ফিরিয়ে এনে কোথায় রাখতে হবে? উত্তর হলো 'আত্মন্যেব'—অর্থাৎ নিজের ভেতরের পরমাত্মার জ্যোতিতে। মন যখন কোনো বিষয় পায় না, তখন সে অস্থির হয়। তাই তাকে এক উচ্চতর বিষয়ের সাথে যুক্ত করতে হয়। পরমেশ্বর বা নিজের শুদ্ধ সত্তার চিন্তা হলো সেই পরম আশ্রয়। যখন মন বুঝতে পারে যে বাইরের বিষয়ের চেয়ে অন্তরের আনন্দ অনেক বেশি গভীর, তখন সে নিজে থেকেই সেখানে স্থির হতে শুরু করে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সহনশীলতা ও ধৈর্য শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিকতা কোনো জাদুকরী বিষয় নয় যে এক নিমেষে হয়ে যাবে। এটি একটি নিয়মিত অনুশীলন। মনকে বারবার শাসন করার মাধ্যমেই আমরা প্রকৃত আত্মিক স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাই।