॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ২৭ ॥

প্রশান্তমনসং হ্যেনং যোগিনং সুখমুত্তমম্ ।
উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতমকল্মষম্ ॥ ৬.২৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

যাঁঁর মন পরম শান্ত, যাঁর রজোগুণ স্তিমিত হয়েছে, যিনি পাপমুক্ত এবং যিনি ব্রহ্মের সাথে একীভূত হয়েছেন—এমন যোগী পরম সুখ লাভ করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি একজন সফল যোগীর মানসিক আনন্দ এবং তাঁর দিব্য অবস্থার বর্ণনা দেয়। যখন মন বশীভূত হয়, তখন মানুষ কী ধরনের উচ্চতায় পৌঁছায়, শ্রীকৃষ্ণ এখানে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।

১. প্রশান্ত মন ও রজোগুণ দমন: মানুষের অশান্তির মূল কারণ হলো 'রজোগুণ'। এই গুণ মানুষকে কর্মে উম্মত্ত করে এবং কামনার পেছনে দৌড়াতে বাধ্য করে। যোগী যখন তাঁর মনকে বশ করেন, তখন তাঁর ভেতরের এই রজোগুণ শান্ত হয়ে যায় (শান্তরজসম)। ফলে তাঁর মন হয়ে ওঠে 'প্রশান্ত'। এটি কোনো সাময়িক শান্তি নয়, এটি সাগরের অতল গভীরে থাকা সেই স্তব্ধতা যা ওপরের ঢেউয়ের দ্বারা বিচলিত হয় না। এই প্রশান্তিই হলো আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি।

২. ব্রহ্মভূত ও অকল্মষম্: 'অকল্মষম্' মানে হলো নিষ্পাপ অবস্থা। আমাদের সব পাপ বা কলুষতা আসে স্বার্থপর চিন্তা থেকে। যোগী যখন নিজেকে পরমাত্মার অংশ হিসেবে দেখেন, তখন তাঁর মন থেকে সব কালিমা মুছে যায়। তিনি তখন 'ব্রহ্মভূত' বা ব্রহ্মের স্বরূপ লাভ করেন। এর অর্থ হলো তাঁর ক্ষুদ্র 'আমি' বিশাল 'পরমাত্মা'র সাথে এক হয়ে যায়। যেমন একটি জলবিন্দু সাগরে মিশলে সে নিজেও সাগর হয়ে যায়, যোগীও তেমনি বিশ্বজনীন চেতনার অধিকারী হন।

৩. সুখমুত্তমম্ বা শ্রেষ্ঠ সুখ: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন এই অবস্থার সুখ হলো 'উত্তম' বা সর্বোচ্চ। জগতের সুখ হলো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল—আজ টাকা আছে তাই সুখ, কাল নেই তাই দুঃখ। কিন্তু ব্রহ্মের সাথে একীভূত হওয়ার যে সুখ, তা অক্ষয়। এই সুখের স্বাদ একবার যিনি পান, তাঁর কাছে ইন্দ্রিয়ের সুখ নগণ্য মনে হয়। এটি এক প্রকারের পরমানন্দ যা মানুষকে অমরত্বের স্বাদ দেয়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের ত্যাগের সঠিক সংজ্ঞা দেয়। আমরা অনেক সময় মনে করি ধর্ম মানে কেবল নিয়ম পালন। কিন্তু প্রকৃত ধর্ম হলো মনের এই প্রশান্তি লাভ করা। যখন আমরা রজোগুণের তাড়না থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মে স্থির হই, তখনই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সফল হয়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে নিজেকে পাপমুক্ত করে পরম সুখের অধিকারী হওয়া যায়।