॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ২৮ ॥

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগতকল্মষঃ ।
সুখেন ব্রহ্মসংস্পর্শমত্যন্তং সুখমশ্নুতে ॥ ৬.২৮ ॥

সরল ভাবার্থ:

এইভাবে নিয়মিত যোগ অভ্যাসের দ্বারা নিষ্পাপ যোগী অনায়াসেই ব্রহ্মের সান্নিধ্যজনিত পরম সুখ লাভ করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটিতে সাধনার ফল এবং ঈশ্বরের সাথে মিলনের সহজলভ্যতার কথা বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা আবারও গুরুত্ব দিয়ে বুঝিয়েছেন।

১. সদা অভ্যাসের ফল: 'যুঞ্জন্নেবং সদা'—অর্থাৎ যিনি বিরতিহীনভাবে নিজেকে যোগে নিযুক্ত রাখেন। আধ্যাত্মিক জীবনে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমরা যদি একদিন খুব সাধনা করি আর সাতদিন না করি, তবে মন আবার পুরনো অবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে মন যখন অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে নিজে থেকেই কলুষমুক্ত বা 'বিগতকল্মষঃ' হয়। এই অবস্থায় পৌঁছালে সাধনা আর কঠিন মনে হয় না, বরং তা আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।

২. ব্রহ্মসংস্পর্শ ও অত্যন্ত সুখ: 'ব্রহ্মসংস্পর্শ' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল কল্পনা নয়, এটি হলো সরাসরি ঈশ্বরের স্পর্শ অনুভব করা। যোগী যখন ব্রহ্মের সাথে যুক্ত হন, তখন তিনি এক সীমাহীন বা 'অত্যন্ত' সুখ লাভ করেন। এই সুখের কোনো শেষ নেই। জগতের সব আনন্দ পরিমেয়, কিন্তু ব্রহ্মের আনন্দ অপরিমেয়। সাধক তখন বুঝতে পারেন যে ঈশ্বর তাঁর থেকে দূরে নন, তিনি তাঁর হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছেন।

৩. সহজ লভ্যতা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'সুখেন' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো খুব অনায়াসেই বা সহজে। আমরা মনে করি মোক্ষ লাভ করা হয়তো পাহাড় কাটার মতো কঠিন। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, যদি কেউ নিজেকে পবিত্র করে নিয়মিত অভ্যাস করেন, তবে ঈশ্বরকে পাওয়া খুব সহজ হয়ে যায়। এটি এক প্রকারের স্বাভাবিক মিলন। যেমন নদী সাগরের দিকে ধাবিত হওয়া স্বাভাবিক, পবিত্র মনের ঈশ্বরে লীন হওয়াও তেমনি স্বাভাবিক।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের উৎসাহিত করে। এটি আমাদের ভয় দূর করে এবং শেখায় যে আমরা যদি সত্য পথে চলি, তবে পরম আনন্দ লাভ আমাদের হাতের নাগালেই আছে। এটি আমাদের জীবনে পবিত্রতা ও নিষ্ঠার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। যখন আমরা নিজেকে শুদ্ধ করি, তখনই আমরা সেই পরম ব্রহ্মের স্পর্শ পাওয়ার যোগ্য হই।