॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩১ ॥

সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ ।
সর্বথা বর্তমানেঽপি স যোগী ময়ি বর্ততে ॥ ৬.৩১ ॥

সরল ভাবার্থ:

যিনি সমস্ত ভূতে স্থিত আমাকে অভেদজ্ঞানে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন—সর্বদা আমাতেই অবস্থান করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি আধ্যাত্মিক জীবনের এক পরম স্বাধীনতার কথা বলে। যোগী যখন একবার পরম সত্যের সাথে যুক্ত হন, তখন তাঁর বাইরের কাজকর্ম তাঁর ভেতরের শান্তিতে কোনো বিঘ্ন ঘটাতে পারে না।

১. অভেদজ্ঞানে ভজনা: 'একত্বমাস্থিতঃ'—এর অর্থ হলো একত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যোগী জানেন যে প্রতিটি প্রাণীর ভেতরে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পরমাত্মা রূপে বিরাজ করছেন। তাই তিনি যখন কোনো আর্তের সেবা করেন বা কারো প্রতি দয়া দেখান, তখন তিনি আসলে কৃষ্ণেরই পূজা করেন। তাঁর কাছে পূজা কেবল ফুল-বেলপাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিটি কাজই পূজায় রূপান্তরিত হয়। তিনি বিভেদ ভুলে গিয়ে সবার মাঝে সেই একই অখণ্ড সত্যকে ভজনা করেন।

২. কর্ম ও যোগের সমন্বয়: শ্লোকের একটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক কথা হলো 'সর্বথা বর্তমানেঽপি'। এর অর্থ হলো যোগী যে কোনো অবস্থাতেই থাকুন না কেন। তিনি হতে পারেন একজন রাজা, একজন সৈনিক বা একজন গৃহস্থ। বাইরের জগতের কর্মকাণ্ডে তিনি লিপ্ত থাকলেও তাঁর মন সবসময় ঈশ্বরের চরণে স্থির থাকে। যেমন একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী নাচের সময় মাথার কলস সামলে রাখেন, তেমনি যোগী সংসারের কাজ করেও তাঁর মনকে ঈশ্বরের থেকে বিচ্যুত হতে দেন না।

৩. ময়ি বর্ততে বা ঈশ্বরে বাস: এমন যোগী যেখানেই যান বা যা-ই করুন, তিনি আসলে ভগবানের কোলেই বাস করেন। তাঁর কোনো কাজই তাঁকে বন্ধনে ফেলে না, কারণ তাঁর মধ্যে কোনো আমিত্ব বা অহংকার নেই। তিনি নিজেকে যন্ত্র এবং ভগবানকে যন্ত্রী হিসেবে দেখেন। এই আত্মসমর্পণই তাঁকে জাগতিক ঘাত-প্রতিঘাত থেকে মুক্ত রাখে। তিনি জানেন যে তাঁর প্রতিটি নিশ্বাস এবং প্রতিটি কাজ ভগবানের ইচ্ছায় ঘটছে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের কর্মের মাঝে উপাসনা করার পথ দেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে ঈশ্বর পাওয়ার জন্য কর্ম ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, বরং কর্মের মধ্য দিয়ে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করাই হলো আসল যোগ। এটি আমাদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করে এবং সেই সাথে অন্তরের শান্তি বজায় রাখতে শেখায়।