॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩২ ॥

আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোঽর্জুন ।
সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ ॥ ৬.৩২ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে অর্জুন! যিনি নিজের সাথে তুলনা করে অন্যের সুখ ও দুঃখকে সর্বত্র সমানভাবে দর্শন করেন, তিনিই আমার মতে শ্রেষ্ঠ যোগী।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক অত্যন্ত মহানুভব দর্শন। এটি কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, এটি হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নৈতিকতার ভিত্তি। এখানে 'আত্মৌপম্যেন' শব্দটি দিয়ে তিনি এক বিশাল সত্য প্রকাশ করেছেন।

১. নিজের সাথে তুলনা (Empathy): 'আত্মৌপম্যেন' মানে হলো নিজেকে অপরের জায়গায় বসিয়ে দেখা। আমরা যখন নিজের শরীরে আঘাত পাই, তখন আমাদের যেমন কষ্ট হয়, অন্য কেউ আঘাত পেলেও তেমনি কষ্ট হয়—এই বোধটুকুই হলো প্রকৃত যোগ। শ্রেষ্ঠ যোগী কেবল ধ্যান করেন না, তিনি অন্যের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু হন। তিনি জানেন যে নিজের জন্য সুখ যেমন কাম্য, অন্যের জন্যও সুখ তেমনি কাম্য। তাই তিনি কখনো অন্যকে কষ্ট দেন না।

২. সুখ-দুঃখের সমতা: সাধারণ মানুষ অন্যের দুঃখে বিচলিত হয় না, বা অন্যের সুখে ঈর্ষা করে। কিন্তু পরম যোগী অন্যের সুখ দেখে নিজের সুখের মতোই আনন্দিত হন এবং অন্যের দুঃখে ব্যথিত হন। এই পরদুঃখকাতরতাই হলো আধ্যাত্মিক সার্থকতা। তিনি জানেন যে জগতের সব প্রাণীর অনুভূতি এক। এই সমদর্শনই তাঁকে স্বার্থপরতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। তিনি জগৎকে এক বড় পরিবার হিসেবে দেখেন।

৩. পরমো মতঃ বা শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেই যোগীকে 'পরম' বা শ্রেষ্ঠ বলেছেন যিনি মানুষের প্রতি প্রেম ও সহানুভূতিশীল। কেবল নির্জনে বসে থাকা যোগীর চেয়ে যিনি জগতের কান্না মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তিনি ভগবানের বেশি প্রিয়। ধর্ম মানে কেবল নিজের মোক্ষ নয়, ধর্ম মানে আর্তের সেবা এবং প্রেমের বিস্তার। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি মানবতার চূড়ান্ত কথা বলে। এটি আমাদের শেখায় যে ভক্তির প্রকৃত পরীক্ষা হলো আমাদের আচরণে। আমরা যদি ঈশ্বরকে ভালোবাসি, তবে তাঁর সৃষ্টিকেও ভালোবাসতে হবে। যখন আমরা প্রতিটি মানুষের ভেতরে নিজেকে দেখতে শিখব, তখনই আমাদের জীবনের সব হিংসা ও অশান্তি চিরতরে দূর হয়ে যাবে। এটিই হলো প্রকৃত গীতার সারমর্ম।