॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩৩ ॥

অর্জুন উবাচ ।
যোহয়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন ।
এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম ॥ ৬.৩৩ ॥

সরল ভাবার্থ:

অর্জুন বললেন—হে মধুসূদন! তুমি সমদর্শনের যে যোগের কথা বললে, মনের চঞ্চলতার কারণে আমি তাঁর স্থায়িত্ব দেখতে পাচ্ছি না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি অর্জুনের অত্যন্ত সৎ এবং মানবিক একটি স্বীকারোক্তি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া উচ্চতর দর্শনের সামনে অর্জুন একজন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন।

১. বাস্তব জীবনের সংশয়: অর্জুন এখানে মধুসূদনকে বলছেন যে, সমদর্শন বা ধ্যানের মাধ্যমে মনকে স্থির করা শুনতে খুব ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবে তা পালন করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ যখন জগতের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে থাকে, তখন সবার প্রতি সমান দৃষ্টি রাখা বা মনকে অবিচল রাখা এক প্রকার অসম্ভব মনে হয়। অর্জুনের এই প্রশ্নটি আমাদের সবার প্রশ্ন। আমরাও অনেক সময় আধ্যাত্মিক কথা শুনি কিন্তু কাজের সময় তা ভুলে যাই। অর্জুন এখানে কোনো ভান না করে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করেছেন।

২. মনের চঞ্চলতা: অর্জুন জানেন যে মন ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়। এখন যে মন ভক্তির রসে মজে আছে, একটু পরেই সে ক্রোধ বা কামনার বশবর্তী হতে পারে। এই অস্থিরতার কারণে ধ্যানের সেই 'স্থির স্থিতি' বা স্থায়ী শান্তি পাওয়া যায় না। অর্জুন বুঝতে পারছেন যে তাত্ত্বিকভাবে বোঝা এক কথা আর বাস্তবে সেই স্তরে পৌঁছানো আরেক কথা। মনের এই অনিয়ন্ত্রিত গতিই যোগের পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর।

৩. জিজ্ঞাসুর ব্যাকুলতা: অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে 'মধুসূদন' বলে সম্বোধন করেছেন। মধু নামক অসুরকে তিনি বধ করেছিলেন, তাই অর্জুন আশা করছেন যে কৃষ্ণ তাঁর মনের এই চঞ্চলতারূপ অসুরকেও বধ করবেন। একজন আদর্শ শিষ্যের গুণ হলো গুরুর কাছে নিজের অসারতা প্রকাশ করা। অর্জুন এখানে প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল শ্রোতা নন, তিনি সত্যই এই পথে চলতে চান বলেই তাঁর মনে এই প্র্যাকটিক্যাল সমস্যার উদয় হয়েছে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিক পথে সংশয় থাকা স্বাভাবিক। নিজেকে বড় যোগী হিসেবে জাহির না করে নিজের অসম্পূর্ণতা স্বীকার করাই হলো জ্ঞানের প্রথম ধাপ। এটি আমাদের উৎসাহিত করে যে আমরা যদি ভগবানের কাছে আমাদের সমস্যার কথা জানাই, তবে তিনি অবশ্যই আমাদের পথ দেখাবেন। অর্জুনের এই সততাই গীতার পরবর্তী মহান উপদেশগুলোর পথ প্রশস্ত করেছে।