॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩৪ ॥

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢম্ ।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্ ॥ ৬.৩৪ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে কৃষ্ণ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয়কে মন্থনকারী, অত্যন্ত বলবান এবং নাছোড়বান্দা। বাতাসকে মুঠোয় ধরা যেমন কঠিন, এই মনকে বশ করাও আমি তেমনই কঠিন মনে করি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি মনের প্রকৃত চরিত্র এবং তাঁর প্রবল শক্তির এক বিশ্বজনীন বর্ণনা। অর্জুন এখানে মনের চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন যা প্রতিটি সাধকের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়।

১. মনের চার রূপ: প্রথমত, মন হলো 'চঞ্চল'—সে এক মুহূর্তও স্থির থাকে না। দ্বিতীয়ত, 'প্রমাথি'—সে বুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করে এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে অশান্ত করে তোলে। তৃতীয়ত, 'বলবৎ'—অর্থাৎ মন অত্যন্ত শক্তিশালী। যুক্তি দিয়ে তাকে থামানো যায় না। চতুর্থত, 'দৃঢ়ম্'—সে নিজের জিদে অটল থাকে। কোনো কু-অভ্যাস একবার ধরলে সে সহজে তা ছাড়তে চায় না। অর্জুনের এই বিশ্লেষণটি মনোবিজ্ঞানের এক গভীর সত্য। আমরা প্রায়ই জানি কোনো কাজ খারাপ, কিন্তু মনের প্রবল টানে আমরা তা করতে বাধ্য হই।

২. বাতাসের উপমা: অর্জুন এখানে এক চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলছেন, আকাশের বিশাল বাতাসকে কি কেউ মুঠোয় ভরে আটকে রাখতে পারে? অসম্ভব! মনকে বশ করা ঠিক তেমনই অসাধ্য কাজ। বাতাস যেমন অদৃশ্য কিন্তু প্রবল শক্তিশালী, মনও তেমনি। সে এক নিমিষে আমাদের অতীতের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেয় আবার পরক্ষণেই ভবিষ্যতের আকাশকুসুম কল্পনায় নিয়ে যায়। এই অদৃশ্য শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সহজ নয়।

৩. অর্জুনের অসহায়ত্ব: অর্জুন একজন শ্রেষ্ঠ বীর, যিনি বিশাল সেনাবাহিনী জয় করেছেন। কিন্তু তিনি স্বীকার করছেন যে বাইরের শত্রু জয় করা সহজ হলেও ভেতরের এই শত্রুকে জয় করা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি আমাদের বিনয় শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেবল শারীরিক শক্তি যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন এক আধ্যাত্মিক শক্তির সাহায্য।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি সাধনার পথে বিনয় ও সজাগ থাকার শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা যেন আমাদের মনকে ছোট করে না দেখি। মনের শক্তিকে স্বীকার করে নিয়েই আমাদের সাধনা শুরু করতে হবে। অর্জুনের এই হাহাকার আসলে শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে সেই পরম সমাধান বের করে আনার এক মাধ্যম, যা পরবর্তী শ্লোকে প্রকাশিত হবে। এটি প্রতিটি মানুষের চিরন্তন সংগ্রামের কথা বলে।