॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩৫ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্ ।
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে ॥ ৬.৩৫ ॥

সরল ভাবার্থ:

শ্রীভগবান বললেন—হে মহাবীর অর্জুন! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং তাকে বশ করা কঠিন। কিন্তু হে কুন্তীনন্দন! নিয়মিত অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের দ্বারা তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার এবং আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাধান। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের হতাশা দূর করে মন জয়ের দুই অমোঘ অস্ত্রের কথা বলেছেন—অভ্যাস ও বৈরাগ্য।

১. অর্জুনের প্রতি সহমর্মিতা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে প্রথমেই অর্জুনের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেননি যে তুমি ভুল বলছো। বরং তিনি বলেছেন 'অসংশয়ং'—অর্থাৎ তোমার কথা একদম ঠিক। মনকে বশ করা সত্যিই কঠিন। এই স্বীকৃতি অর্জুনকে মানসিকভাবে শান্তি দেয় যে ভগবান তাঁর সমস্যা বুঝতে পেরেছেন। কৃষ্ণ তাঁকে 'মহাবাহো' বলে সম্বোধন করেছেন যাতে তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে বাইরের যুদ্ধ যে বীর জয় করতে পারে, সে ভেতরের যুদ্ধও জয় করতে পারবে।

২. অভ্যাসের শক্তি: মন জয়ের প্রথম ওষুধ হলো 'অভ্যাস'। অভ্যাস মানে হলো মন যখনই পালিয়ে যাবে, তাকে বারবার ভালো কাজে বা ঈশ্বরের চিন্তায় ফিরিয়ে আনা। এটি একদিনে হবে না। যেমন ছোট শিশুকে হাঁটতে শেখাতে হয় বারবার পড়ার পরও তুলে দাঁড় করাতে হয়, মনকেও তেমনি প্রশিক্ষণ দিতে হয়। নিয়মিত নাম জপ, ধ্যান বা সৎ চিন্তা হলো এই অভ্যাসের অংশ। অভ্যাস যখন গভীর হয়, তখন মন নিজে থেকেই চঞ্চলতা ত্যাগ করে শান্তির সাগরে ডুব দেয়।

৩. বৈরাগ্যের প্রয়োজনীয়তা: দ্বিতীয় ওষুধ হলো 'বৈরাগ্য'। বৈরাগ্য মানে জগত ছেড়ে পালানো নয়, বরং জগতের অনিত্যতা বোঝা। মন বিষয়ের দিকে কেন দৌড়ায়? কারণ সে মনে করে বিষয়গুলো তাকে সুখ দেবে। কিন্তু যখন মানুষ বুঝতে পারে যে জাগতিক সুখ ক্ষণস্থায়ী এবং এর পেছনে কেবল দুঃখ আছে, তখন মনের সেই বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। এই অনাসক্তিই হলো বৈরাগ্য। অভ্যাস আমাদের মনকে সঠিক দিকে নিয়ে যায়, আর বৈরাগ্য আমাদের ভুল দিক থেকে ফিরিয়ে আনে। এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই মন বশীভূত হয়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের নিরাশা থেকে মুক্তির পথ দেখায়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে গ্যারান্টি দিচ্ছেন যে যতই কঠিন হোক, মনকে জয় করা অসম্ভব নয়। কেবল প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক পদ্ধতি। এটি আমাদের শেখায় যে ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, বরং বারবার চেষ্টা করাই হলো আধ্যাত্মিকতা। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে সাফল্যের মূল মন্ত্র হিসেবে কাজ করে।