॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৩৬ ॥

অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ ।
বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোঽবাপ্তুমুপায়তঃ ॥ ৬.৩৬ ॥

সরল ভাবার্থ:

যাঁর মন বশীভূত নয়, তাঁর পক্ষে যোগলাভ করা অত্যন্ত কঠিন—এটিই আমার অভিমত। কিন্তু যাঁর মন বশীভূত এবং যিনি সঠিক উপায় অবলম্বন করে চেষ্টা করেন, তাঁর পক্ষে যোগলাভ করা সম্ভব।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক চূড়ান্ত রায় বা জাজমেন্ট। আগের শ্লোকে তিনি মন নিয়ন্ত্রণের দুটি কৌশলের কথা বলেছেন, আর এখানে তিনি সেই কৌশলের সফলতার মূল চাবিকাঠি বলে দিচ্ছেন।

১. অসংযত মন ও ব্যর্থতা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে সাফ বলে দিয়েছেন যে, ‘অসংযতাত্মনা’ অর্থাৎ যার নিজের ওপর কোনো লাগাম নেই, সে যতই ধর্মীয় ভেক ধরুক না কেন, তার পক্ষে যোগ বা পরম শান্তি পাওয়া অসম্ভব। আমাদের মন যদি সারাদিন কাম-ক্রোধ-লোভ আর দুনিয়ার ভাবনায় ডুবে থাকে, তবে দিনে আধা ঘণ্টা চোখ বন্ধ করে বসলে কোনো লাভ হবে না। মনকে বশ না করে যোগের চেষ্টা করা মানে হলো ফুটো কলসিতে জল ভরার মতো। জল যতটাই দেবেন, সব নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তাই নিজেকে সংযত করা হলো যোগের প্রথম এবং প্রধান শর্ত।

২. উপায় এবং প্রচেষ্টার সমন্বয়: ভগবান কেবল কঠিন কথা বলেননি, আশার আলোও দেখিয়েছেন। তিনি বলছেন ‘যততা শক্যো’—অর্থাৎ চেষ্টা করলে এটি সম্ভব। কিন্তু সেই চেষ্টা হতে হবে ‘উপায়তঃ’ বা সঠিক পদ্ধতিতে। ভুল পদ্ধতিতে হাজার বছর চেষ্টা করলেও যেমন লোহা থেকে সোনা হয় না, তেমনি ভুল সাধনায় ঈশ্বর পাওয়া যায় না। সঠিক উপায় হলো—শাস্ত্রীয় বিধি মেনে চলা, গুরুর নির্দেশ পালন করা এবং নিরন্তর অভ্যাস করা। মন যখন দেখবে যে তার মালিক (সাধক) খুব জেদি এবং তাকে বারবার ফিরিয়ে আনছে, তখন ধীরে ধীরে মন বশ্যতা স্বীকার করে।

৩. মানসিক দৃঢ়তা: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা কোনো অলৌকিক জাদু নয়, এটি নিজের ওপর নিজের বিজয়। আমরা বাইরে অনেক শত্রু জয় করি, কিন্তু নিজের মনের মতো বড় শত্রু আর নেই। যার মন তার নিজের বশে আছে, সে-ই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি। এই বশ্যতা অর্জিত হলে যোগ আর স্বপ্ন থাকে না, বরং তা হাতের মুঠোয় চলে আসে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের অলসতা ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাফল্য কেবল আকাঙ্ক্ষায় আসে না, আসে যথাযথ শ্রমে। আমরা যদি প্রতিনিয়ত আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে শাসন করি এবং ভগবানের পথে চালিত করি, তবে একদিন আমরা সেই পরম স্তরে পৌঁছাবই যেখানে কোনো বিচ্যুতি নেই। এটি আত্মিক বিজ্ঞানের এক ধ্রুব সত্য।