অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম্ ।
এতদ্ধি দুর্লভতরং লোকে জন্ম যদিদৃশম্ ॥ ৬.৪২ ॥
সরল ভাবার্থ:
অথবা তিনি জ্ঞানবান যোগীদের কুলে জন্মগ্রহণ করেন। এই জগতে এ ধরনের জন্ম অত্যন্ত দুর্লভ।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
আগের শ্লোকে ধনাঢ্য পরিবারে জন্মের কথা বলার পর, এখানে শ্রীকৃষ্ণ আরও উচ্চতর এক ভাগ্যের কথা বলেছেন। এটি সেই সব সাধকদের জন্য যারা সাধনায় অনেক দূর এগিয়েও সিদ্ধি পাননি।
১. যোগীকুলে জন্ম: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যারা তীব্র বৈরাগ্য নিয়ে সাধনা করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেহত্যাগ করেছেন, তাঁরা সরাসরি ‘ধীমতাং যোগিনাম’ অর্থাৎ জ্ঞানী ও যোগী পরিবারে জন্ম নেন। এটি ৪১ নম্বর শ্লোকের চেয়েও বড় পুরস্কার। ধনী পরিবারে ভোগের সুযোগ থাকে যা সাধককে বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু যোগী পরিবারে ভোগের পরিবর্তে কেবল ‘যোগ’ ও ‘ভক্তি’র পরিবেশ থাকে। এমন পরিবারে বাবা-মা নিজেই গুরু হন। শিশুটি দোলনায় থাকতেই ভগবানের নাম ও তত্ত্ব শুনতে পায়। তাঁর রক্তে ও মজ্জায় আধ্যাত্মিকতা মিশে থাকে।
২. দুর্লভ জন্ম: শ্রীকৃষ্ণ এই জন্মকে ‘দুর্লভতর’ বলেছেন। কেন? কারণ পৃথিবীতে রাজা বা কোটিপতির ঘরে জন্মানো সহজ, কিন্তু একজন সত্যিকারের তত্ত্বজ্ঞানী যোগীর ঘরে জন্মানো অনেক কঠিন। এর জন্য গত জন্মের তীব্র ব্যাকুলতা প্রয়োজন হয়। এমন জন্মে সাধককে নতুন করে কিছু শিখতে হয় না, বরং তাঁর পূর্বজন্মের জ্ঞান সরাসরি প্রকাশ পায়। আমরা অনেক সময় দেখি কিছু শিশু খুব অল্প বয়সেই গভীর আধ্যাত্মিক কথা বলে বা ধ্যানে বসে—এগুলোই হলো সেই দুর্লভ জন্মের লক্ষণ। এটি ভগবানের এক বিশেষ কৃপা যা কেবল নিষ্ঠাবান সাধকরাই পান।
৩. আর্থিক সম্পদের চেয়ে আত্মিক সম্পদ বড়: এই শ্লোকটি আমাদের মূল্যবোধকে বদলে দেয়। আমরা সাধারণত সম্পদশালী পরিবারে জন্ম নেওয়াকে সৌভাগ্য মনে করি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আধ্যাত্মিক পরিবেশের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। যে পরিবারে ঈশ্বরচর্চা হয়, সেই পরিবারই শ্রেষ্ঠ। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের সন্তানদের জন্য টাকা-পয়সা রেখে যাওয়ার চেয়ে ভালো ‘সংস্কার’ ও ‘পরিবেশ’ রেখে যাওয়া অনেক বেশি জরুরি। কারণ সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সংস্কার আত্মার সাথে সাথে চলে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সাধনার গভীরতায় উৎসাহিত করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যদি আজ থেকে আন্তরিকভাবে সাধনা করি, তবে আগামী জন্মে আমরা এক উন্নততর চেতনা নিয়ে জন্মানোর টিকিট পেয়ে যাব। ঈশ্বর আমাদের জন্য এমন এক পথ তৈরি করে দেন যেখানে আমাদের মুক্তি নিশ্চিত হয়। এটি আধ্যাত্মিক বিবর্তনের এক মহিমান্বিত সত্য যা আমাদের মৃত্যুকে ভয় পেতে বাধা দেয় এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান করে তোলে।