॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৪৩ ॥

তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্বদৈহিকম্ ।
যতেত চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন ॥ ৬.৪৩ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে কুরুনন্দন! সেখানে তিনি তাঁর পূর্বজন্মের বুদ্ধিসংযোগ বা আধ্যাত্মিক সংস্কার লাভ করেন এবং সিদ্ধি লাভের জন্য পুনরায় নবউদ্যমে চেষ্টা করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি মানুষের মেধা ও রুচির রহস্য উন্মোচন করে। আমরা কেন একেক জন একেক বিষয়ে আগ্রহী হই, তার উত্তর শ্রীকৃষ্ণ এখানে দিয়েছেন। এটি আধ্যাত্মিক রচনার এক গভীর স্তর।

১. বুদ্ধিসংযোগ ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে নতুন শরীর ধারণ করার পর মানুষ তাঁর গত জন্মের অর্জিত জ্ঞান বা ‘বুদ্ধিসংযোগ’ ফিরে পায়। আমাদের এই শরীরের মৃত্যু হলেও আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের বা মনের মৃত্যু হয় না। গত জন্মে আমরা যতটুকু যোগ বা ধ্যান শিখেছিলাম, সেই ফাইলটি পরমাত্মার সার্ভারে সেভ হয়ে থাকে। নতুন জন্মে ঈশ্বর সেই ফাইলটি আবার ওপেন করে দেন। এ কারণেই অনেক সময় দেখা যায় কোনো ছাত্র একবার পড়লেই বুঝে যায়, আর কারো অনেক সময় লাগে। এটি হলো ‘পৌর্বদৈহিকম্’ বা পূর্বজন্মের বুদ্ধির প্রভাব।

২. নবউদ্যমে যাত্রা শুরু: ‘যতেত চ ততো ভূয়ঃ’—এর অর্থ হলো যেখান থেকে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই আবার দৌড় শুরু করা। যোগভ্রষ্ট ব্যক্তিকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয় না। তাঁর মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনা তাঁকে আবার ধ্যানের দিকে ঠেলে দেয়। তিনি আগের জন্মের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সাবধানে পা বাড়ান। এটি একটি ভিডিও গেমের ‘চেকপয়েন্ট’-এর মতো। আপনি হারলে গেমের শুরু থেকে নয়, বরং শেষ চেকপয়েন্ট থেকে আবার শুরু করতে পারেন। ঈশ্বরের এই ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণাময় যা আমাদের ক্লান্ত হতে দেয় না।

৩. পরম লক্ষ্যের দিকে ধাবন: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জীবন একটি অখণ্ড যাত্রা। আমরা ভাবি মৃত্যুতে সব শেষ, কিন্তু আসলে তা কেবল একটি পোশাক বদলানোর মতো। যোগীর আত্মা প্রতিটি জন্মে নিজেকে আরও নিখুঁত করে তোলে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে ‘কুরুনন্দন’ বলে সম্বোধন করেছেন, যাঁর অর্থ হলো কুরুবংশের আনন্দ। তিনি অর্জুনকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো তাঁর ভেতরেও বীরত্ব ও ধর্মের বীজ আছে। আমাদেরও উচিত আমাদের ভেতরের সেই সুপ্ত দেবত্বকে চেনা এবং প্রতিদিন তাকে বিকশিত করা।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সাধনার ধারাবাহিকতায় বিশ্বাস রাখতে শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কেউ নতুন করে শুরু করছি না, আমরা সবাই আমাদের দীর্ঘ এক আধ্যাত্মিক যাত্রার মাঝপথে আছি। আজ আমরা যেটুকু সাধন করব, তা আমাদের চিরস্থায়ী সম্পদ হয়ে থাকবে। এটি আমাদের নিরাশা দূর করে এবং প্রতিদিনের সাধনায় নতুন করে উৎসাহ যোগায়। আমাদের প্রতিটি সৎ চেষ্টা পরজন্মের জন্য এক একটি সফলতার বীজ বপন করে।