তপস্বিভ্যোঽধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যোঽপি মতোঽধিকঃ ।
কর্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্যোগী ভবার্জুন ॥ ৬.৪৬ ॥
সরল ভাবার্থ:
যোগী তপস্বীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সकाम কর্মিদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তাই হে অর্জুন, তুমি যোগী হও।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই শ্লোকটি ষষ্ঠ অধ্যায়ের চূড়ান্ত উপদেশ। এখানে শ্রীকৃষ্ণ যোগীকে সমাজের অন্য সব উচ্চপদস্থ সাধকদের উপরে স্থান দিয়েছেন এবং অর্জুনকে সেই পথ অনুসরণের অমোঘ আহ্বান জানিয়েছেন।
১. তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব: শ্রীকৃষ্ণ এখানে তিন শ্রেণির মানুষের সাথে যোগীর তুলনা করেছেন। প্রথমত ‘তপস্বী’—যারা শরীরকে কষ্ট দিয়ে কঠোর ব্রত পালন করে। দ্বিতীয়ত ‘জ্ঞানী’—যারা কেবল শাস্ত্র পড়ে ও বিচার করে তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করে। তৃতীয়ত ‘কর্মী’—যারা স্বর্গের আশায় বড় বড় যজ্ঞ বা জনহিতকর কাজ করে। কৃষ্ণ বলছেন, যোগী এই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কেন? কারণ তপস্বী কেবল শরীরকে বশ করে, জ্ঞানী কেবল বুদ্ধিকে ব্যবহার করে, আর কর্মী কেবল ফলের আশায় কাজ করে। কিন্তু যোগী তাঁর ‘মনকে’ সরাসরি ঈশ্বরের সাথে যুক্ত করেন। যোগ হলো সমস্ত সাধনার প্রাণ।
২. তস্মাদ্যোগী ভবার্জুন: এটি কৃষ্ণের এক পরম আদেশ—‘হে অর্জুন, তুমি যোগী হও’। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে তুমি কেবল যুদ্ধ করার জন্য যুদ্ধ করো না, বরং তোমার প্রতি মুহূর্তের কাজকে যোগে রূপান্তরিত করো। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি আমরা আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখি এবং কাজকে ঈশ্বরে উৎসর্গ করি, তবে আমরাও একজন যোগী হতে পারি। যোগী হওয়া মানে সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে যাওয়া নয়, বরং সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব পালনের সময় মনকে শ্রীকৃষ্ণের চরণে বেঁধে রাখা। এটিই হলো কর্ম ও ভক্তির অপূর্ব সমন্বয়।
৩. পরম আহ্বান: এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করে দেয়। আমাদের পড়ালেখা, চাকরি বা ব্যবসা—সবকিছুর পেছনে আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্মসংযম ও ঈশ্বরীয় সংযোগ। আমরা যা-ই করি না কেন, যদি আমরা মনের শান্তি ও পবিত্রতা হারিয়ে ফেলি, তবে সেই অর্জনের কোনো মূল্য নেই। শ্রীকৃষ্ণের এই উপদেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর সম্পদে বা পদবীতে নয়, তাঁর আত্মিক স্থিতিতে। যোগই হলো সেই রাস্তা যা মানুষকে পশুত্ব থেকে দেবত্বের দিকে নিয়ে যায়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের আত্মোন্নতির পথ দেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের চেতনাকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া। যখন আমরা প্রতিটি কাজকে ধ্যানের মতো একাগ্রতা দিয়ে করি, তখনই আমরা প্রকৃত যোগী হতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের এই ডাক কেবল অর্জুনের জন্য নয়, এটি প্রতিটি যুগের প্রতিটি মানুষের জন্য এক চিরন্তন আহ্বান। এই আদেশ পালনের মাধ্যমেই আমাদের মানব জন্ম সার্থক হতে পারে।