যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা ।
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ॥ ৬.৪৭ ॥
সরল ভাবার্থ:
সমস্ত যোগীদের মধ্যেও যিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁর অন্তরাত্মা আমার সাথে (কৃষ্ণে) যুক্ত রেখে আমাকে ভজনা করেন, তিনিই আমার মতে শ্রেষ্ঠতম যোগী।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এটি ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষ শ্লোক এবং এই অধ্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণী। এখানে শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানের ঊর্ধ্বে ‘ভক্তি’র স্থান দিয়েছেন, যা গীতার পরবর্তী অধ্যায়গুলোর মূল ভিত্তি।
১. যুক্ততম যোগী: যারা প্রাণায়াম করেন বা অষ্টাঙ্গ যোগ অভ্যাস করেন—সবাই যোগী। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ‘যুক্ততম’ বা শ্রেষ্ঠতম যোগী তিনি, যাঁর মন কেবল নিজের শান্তিতে নয়, বরং তাঁর (কৃষ্ণের) প্রেমে নিমগ্ন। ‘মদ্গতেনান্তরাত্মনা’—যাঁর অন্তরাত্মা সর্বদা কৃষ্ণের চিন্তায় বাস করে। এই একনিষ্ঠ ভক্তিই হলো যোগের শিখর। কেবল শরীর বা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে মনকে শূন্য করা কঠিন, কিন্তু মনকে ভগবানের দিব্য রূপে বা নামে ডুবিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।
২. শ্রদ্ধা ও ভজনার শক্তি: এখানে ‘শ্রদ্ধাবান্’ এবং ‘ভজতে’—এই দুটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রদ্ধা হলো সেই ভিত্তি যার ওপর সাধনার ইমারত দাঁড়ায়। আর ভজনা মানে কেবল গান গাওয়া নয়, বরং নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ঈশ্বরকে সেবা করা। যখন একজন সাধক বুঝতে পারেন যে ভগবান কেবল তাঁর পরম আরাধ্য নন, বরং পরম প্রিয় বন্ধু বা পিতা—তখনই তাঁর ধ্যান সহজ হয়ে যায়। এই ভালোবাসার টান যখন ধ্যানে মিশে যায়, তখন সেই যোগী কৃষ্ণের মতে শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
৩. ভক্তির শ্রেষ্ঠত্ব: এই শ্লোকটি ষষ্ঠ অধ্যায় (আত্মসংযম যোগ) এবং সপ্তম অধ্যায় (জ্ঞানবিজ্ঞান যোগ)-এর মধ্যে এক সেতু হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের শেখায় যে ধ্যান যখন ভক্তির সাথে যুক্ত হয়, তখন তা পূর্ণতা পায়। আমরা যখন আমাদের সমস্ত কাজ, চিন্তা ও অনুভূতি ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করি, তখন আমরাই হই শ্রেষ্ঠ যোগী। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে দিব্য আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের এক পরম আশ্রয়ের কথা বলে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর কেবল বিচারক নন, তিনি আমাদের পরমাত্মীয়। যখন আমরা পরম ভক্তিভরে তাঁর চরণে আশ্রয় নেই, তখন তিনিই আমাদের সমস্ত ভার গ্রহণ করেন। ষষ্ঠ অধ্যায়ের এই সমাপ্তি আমাদের মনে এক দিব্য প্রশান্তি এবং ভক্তির উদ্রেক করে। এটিই হলো প্রকৃত আত্মিক বিজয়।