॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৮ ॥

জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ ।
যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ ॥ ৬.৮ ॥

সরল ভাবার্থ:

যিনি তত্ত্বজ্ঞান ও প্রত্যক্ষ অনুভবের দ্বারা পূর্ণতৃপ্ত, যিনি নির্বিকার বা কূটস্থ, যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ সম্পূর্ণ বশীভূত এবং যাঁর কাছে মাটির ঢিলা, পাথর ও সোনা সমান মূল্যবান—তাঁকেই প্রকৃত যোগী বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি একজন আদর্শ যোগীর চারিত্রিক গভীরতা এবং তাঁর মানসিক স্থিতির এক অপূর্ব বর্ণনা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ যোগীর তিনটি বিশেষ গুণের কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন যা তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে।

১. জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সমন্বয়: শাস্ত্রীয় জ্ঞান বা পুঁথিগত বিদ্যাকে বলা হয় 'জ্ঞান', আর সেই জ্ঞানের যখন আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ ঘটে, তাকে বলা হয় 'বিজ্ঞান'। যোগী কেবল তাত্ত্বিক কথা শোনেন না, তিনি সত্যকে নিজের অন্তরে অনুভব করেন। এই অন্তরের তৃপ্তি তাঁকে জাগতিক কোনো কিছুর অভাববোধ করতে দেয় না। তিনি জানেন যে জগতের প্রতিটি অণুতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে। এই অনুভব যখন দৃঢ় হয়, তখন তাঁর মনে আর কোনো সংশয় থাকে না। তিনি শাস্ত্রের বাণীর ঊর্ধ্বে গিয়ে সত্যের সরাসরি সাক্ষাৎ পান। এই পরম তৃপ্তিই তাঁকে জীবনের চরম লক্ষ্যে স্থির রাখে।

২. কূটস্থ ও বিজিতেন্দ্রিয়: 'কূটস্থ' শব্দটির অর্থ হলো কামারশালার নিহাইয়ের মতো অটল থাকা। নেহাইয়ের ওপর হাজার হাতুড়ির ঘা পড়লেও সে যেমন পরিবর্তন হয় না, যোগীও সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতে অটল থাকেন। সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় বা নিন্দা-স্তুতি—কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের শান্তি নষ্ট করতে পারে না। এর সাথে তিনি হন 'বিজিতেন্দ্রিয়'—অর্থাৎ যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ তাঁর নিজের দাসে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ইন্দ্রিয় তাদের বিষয়ের দিকে টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু যোগীর ইন্দ্রিয় তাঁর বুদ্ধির ইশারায় চলে। তিনি চোখের সামনে সুন্দর বস্তু দেখে যেমন প্রলুব্ধ হন না, তেমনি অপ্রিয় কিছু দেখে বিচলিত হন না।

৩. সমদর্শন বা চূড়ান্ত সাম্যাবস্থা: এই শ্লোকের সবচেয়ে বৈপ্লবিক অংশ হলো 'সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ'। যাঁর কাছে মাটির ঢিলা (লোষ্ট্র), পাথর (অশ্ম) এবং সোনা (কাঞ্চন) সমান মূল্যবান। সাধারণ মানুষের কাছে সোনার আকর্ষণ অনেক, পাথরের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু যোগী জানেন যে প্রতিটি বস্তুই পঞ্চভূতের তৈরি এবং একদিন সব মাটিতেই মিশে যাবে। তিনি বস্তুর উপযোগিতা দেখেন, কিন্তু সেগুলোর ওপর মোহ বা আসক্তি রাখেন না। তিনি দেখেন যে সোনাও যেমন ঈশ্বরের সৃষ্টি, মাটিও তেমনি। এই মানসিকতাই তাঁকে সংসারের মায়ার উর্ধ্বে নিয়ে যায়। তিনি কোনো বস্তুর বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে তার দ্বারা বিচার করেন না, বরং সবকিছুর মূল সত্তাকে অনুভব করেন। এই সাম্যাবস্থাই হলো যোগের প্রকৃত পরিচয়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষণ হলো সমদৃষ্টি। আমরা যখন তুচ্ছ বস্তুর প্রতি আকর্ষণ ত্যাগ করে সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারি, তখনই আমরা যোগের প্রকৃত অধিকারী হই। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধৈর্য এবং স্থিরতা বজায় রাখার অনুপ্রেরণা দেয়।