সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু ।
সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধিৰ্বিশিষ্যতে ॥ ৬.৯ ॥
সরল ভাবার্থ:
যিনি হিতৈষী বন্ধু, মিত্র, শত্রু, নিরপেক্ষ, মধ্যস্থ ব্যক্তি, দ্বেষযোগ্য ব্যক্তি, আত্মীয়-স্বজন এবং এমনকি সাধু ও পাপীদের প্রতিও সমবুদ্ধি পোষণ করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
আগের শ্লোকে জড় বস্তুর প্রতি সমদৃষ্টির কথা বলার পর, এই নবম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টির এক উচ্চতর আদর্শ তুলে ধরেছেন। এটি আধ্যাত্মিক সাধনার অত্যন্ত কঠিন কিন্তু অপরিহার্য একটি পর্যায়।
১. সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা বর্জন: একজন সাধক যখন সমাজের স্তরে বিচরণ করেন, তাঁর সামনে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ৯টি ভিন্ন শ্রেণির উল্লেখ করেছেন: সুহৃদ (স্বার্থহীন বন্ধু), মিত্র (উপকারী), অরি (শত্রু), উদাসীন (নিরপেক্ষ), মধ্যস্থ (মীমাংসাকারী), দ্বেষ্য (ঘৃণ্য ব্যক্তি), বন্ধু (আত্মীয়), সাধু এবং পাপিষ্ঠ। সাধারণ মানুষের আচরণ এই প্রতিটি শ্রেণির ক্ষেত্রে আলাদা হয়। আমরা বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি কিন্তু শত্রুর কথা মনে পড়লেই ক্রোধে জ্বলে উঠি। কিন্তু যোগী দেখেন এই সবার ভেতরেই সেই একই পরমাত্মা বিরাজ করছেন। তিনি জানেন যে বাইরের ব্যবহার হলো মানুষের স্বভাব বা গুণের প্রকাশ, কিন্তু ভেতরের আত্মা নিষ্কলঙ্ক।
২. সাধু ও পাপীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: এটি এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। অধিকাংশ মানুষ পাপীকে ঘৃণা করে এবং দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি দেখেন যে পাপ একটি রোগ মাত্র। তিনি পাপিষ্ঠের ভেতরের দেবত্বকেও স্বীকার করেন এবং তাঁর প্রতি করুণা পোষণ করেন। আবার সাধুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও কোনো প্রকার অন্ধ আসক্তি থাকে না। তাঁর কাছে সাধু এবং অসাধু—উভয়েই ঈশ্বরের বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির অংশ। এই গভীর জীবনবোধ তাঁকে সামাজিক দলাদলি বা পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। তিনি জগতের ভালো-মন্দকে ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে গ্রহণ করেন।
৩. সমবুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্ব: 'সমবুদ্ধিৰ্বিশিষ্যতে'—অর্থাৎ যাঁর বুদ্ধি সবার প্রতি সমান, তিনিই সবার চেয়ে বিশিষ্ট বা শ্রেষ্ঠ। আমাদের রাগ, দ্বেষ এবং পক্ষপাতের কারণেই মনে অশান্তি জন্মায়। যখন আমরা কাউকে আলাদা করে শত্রু বা মিত্র ভাবি না, তখনই আমাদের মন ধ্যানের জন্য প্রস্তুত হয়। এই সাম্যই হলো আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট। যে ব্যক্তি মানুষের বাহ্যিক আচরণ দেখে তাঁকে বিচার করেন না, বরং তাঁর অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক সত্তাকে দেখেন, তিনিই প্রকৃত শান্তিলাভ করেন।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের উদারতা শেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা কেবল মন্দিরে বা ধ্যানে নয়, বরং মানুষের সাথে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। আমরা যখন সমাজকে বৈষম্যের চোখে না দেখে প্রেমের চোখে দেখতে পারি, তখনই আমাদের হৃদয় প্রশস্ত হয় এবং পরমাত্মার সাথে মিলন সহজ হয়।